বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় এমন কিছু জমি, দোকান, পুকুর কিংবা দালানের সন্ধান পাওয়া যায়, যেগুলোর মালিক কোনো ব্যক্তি বা পরিবার নন। এক শ বছর বা তারও বহু আগে কেউ একজন এসব সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা ছেড়ে দিয়ে বিনাশর্তে দান করে গিয়েছিলেন। তারপর থেকে সেগুলো আর কোনো ব্যক্তির সম্পদ নয়, একটি নির্দিষ্ট সামাজিক উদ্দেশ্যের অংশ হিসেবেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কোথাও সেই জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে মসজিদ, কোথাও মাদরাসা, কোথাও ইদগাহ বা কবরস্থান, কোথাও খানকাহ কিংবা ইয়াতিমখানা। আবার কোথাও নিছক একটি বাজার, কয়েকটি দোকান কিংবা কৃষিজমি—যার আয় দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত ওয়াকফ এস্টেটের সংখ্যা ১৬ হাজার ৪০৭। এই তালিকাভুক্তিকরণ এখনো চলমান; ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমান আইনি কাঠামোর ভিত্তি ১৯৩৪ সালের বেঙ্গল ওয়াকফ অ্যাক্ট, যা পরে ১৯৬২ সালের ওয়াকফ অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংশোধিত ও সম্প্রসারিত হয়। তবে এই আইনি কাঠামো নিজেই আরও পুরোনো একটি প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্যের আধুনিক রূপমাত্র। আজকের হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ ওয়াকফ এস্টেট কিংবা পাগলা মসজিদ ওয়াকফ এস্টেট যে প্রাতিষ্ঠানিক যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, মূলত একই যুক্তিতে আজ থেকে ছয় শতাব্দীরও বেশি আগে গড়ে উঠেছিল পান্ডুয়ার বাইশ হাজারী ও ছয় হাজারী ওয়াকফ।

সুলতানি বাংলার ইতিহাসে এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং সিলসিলাগত একটি ধারা। রিচার্ড ইটনের গবেষণা দেখায়, বাংলার পূর্বাঞ্চলীয় বদ্বীপে ঘন বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে জনবসতি গড়ে তোলা এবং নতুন কৃষি বসতি বিস্তারের কাজে সুফি ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বেরা নেতৃত্ব দিতেন। সেই বসতিগুলোর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার জন্য শাসকেরা তাঁদের রাজস্বমুক্ত জমি ওয়াকফ হিসেবে দান করতেন। বাগেরহাটে খান জাহান আলীকে ঘিরে গড়ে ওঠা মসজিদ-নগর কিংবা সিলেটে শাহ জালালের দরগাহকেন্দ্রিক জনবসতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একজন ধর্মীয় নেতাকে ঘিরে গড়ে ওঠা সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ ওয়াকফের মাধ্যমে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। রাজশাহীতে শাহ মখদুম রূপোশের দরগাহকেন্দ্রিক ওয়াকফ সম্পত্তিও একই ধারার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

এগুলো নিছক ধর্মীয় স্মৃতিচিহ্ন নয়; এমন সব প্রতিষ্ঠান, যেগুলো একের পর এক রাজবংশের উত্থান-পতন দেখেছে, স্বাধীন সালতানাতের অবসান দেখেছে, মুঘল শাসনের আগমন দেখেছে, ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিষ্ঠা ও অবসান দেখেছে, এমনকি রাষ্ট্রের নাম ও রাজনৈতিক পরিচয়ও বদলাতে দেখেছে। কিন্তু নিজের প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্ব ধরে রেখেছে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, ওয়াকফের মধ্যে এমন কী ছিল, যা তাকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে একধরনের স্থায়িত্ব দিয়েছে? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই প্রতিষ্ঠানটি আসলে সমাজের জন্য কী কাজ করত?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই একটি প্রচলিত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হয়। আমরা সাধারণত ওয়াকফকে ব্যক্তিগত ধার্মিকতার বহিঃপ্রকাশ কিংবা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে করা একটি দান হিসেবে দেখি। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যায়, ওয়াকফ শুধু দান নয়। এটি ছিল একটি সুসংগঠিত প্রতিষ্ঠান যার নিজস্ব আইনি যুক্তি ছিল, নিজস্ব অর্থনৈতিক কাঠামো ছিল এবং সময়ের দীর্ঘ প্রবাহে টিকে থাকার জন্য নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ওয়াকফের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এভাবে—মুসলিম আইনে স্বীকৃত ধর্মীয়, পুণ্য বা দাতব্য কোনো উদ্দেশ্যে একজন মুসলমানের স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির স্থায়ী উৎসর্গীকরণকে ওয়াকফ বলা হয়। এই সংজ্ঞার মধ্যে দুটি শব্দ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—‘স্থায়ী’ এবং ‘উৎসর্গীকরণ’। কারণ, এখানেই ওয়াকফের সঙ্গে সাধারণ দানের মৌলিক পার্থক্য নিহিত।

সাধারণ দানের ক্ষেত্রে একটি সম্পত্তির মালিকানা এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির হাতে চলে যায়। নতুন মালিক চাইলে সেই সম্পত্তি বিক্রি করতে পারেন, বন্ধক রাখতে পারেন কিংবা উত্তরাধিকারসূত্রে ভাগ করে দিতে পারেন। কিন্তু ওয়াকফের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনাগুলোর কোনোটিই আর খোলা থাকে না। একবার কোনো সম্পত্তি ওয়াকফ ঘোষিত হলে শরিয়ার দৃষ্টিতে তার মালিকানা আল্লাহর কাছে ন্যস্ত হয়েছে বলে বিবেচিত হয়; মানুষের হাতে থাকে কেবল সেই সম্পত্তির তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব। অর্থাৎ মুতাওয়াল্লি সম্পত্তির রক্ষক, কিন্তু মালিক নন।

মুতাওয়াল্লি সম্পত্তির রক্ষক, কিন্তু মালিক নন।

এই শরয়ি সংজ্ঞাকে যদি প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির ভাষায় অনুবাদ করা হয়, তাহলে ওয়াকফের প্রকৃত তাৎপর্য আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। অর্থনীতিবিদ তিমুর কুরান তাঁর বহুল আলোচিত গবেষণায় দেখিয়েছেন, ওয়াকফ মূলত একটি বিশ্বাসযোগ্য অঙ্গীকার-ব্যবস্থা হিসেবে বিকশিত হয়েছিল। অর্থাৎ এটি এমন এক ব্যবস্থা, যা একদিকে সম্পদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করত, অন্যদিকে সেই সম্পদ ব্যবহার করত সমাজের জন্য স্থায়ী জনকল্যাণমূলক সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে। কুরানের যুক্তি হলো, মধ্যযুগীয় মুসলিম সমাজে যেখানে রাষ্ট্রের হাতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ধর্মীয় কর্মকাণ্ড বা দরিদ্র সহায়তার মতো ক্ষেত্রগুলো পরিচালনার কোনো স্থায়ী আমলাতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি, সেখানে ওয়াকফ বিকেন্দ্রীভূত উপায়ে সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছিল।

এই ব্যবস্থার দুটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, ওয়াকফ সম্পত্তিকে স্থায়ীভাবে বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। একবার কোনো জমি বা সম্পত্তি ওয়াকফ হয়ে গেলে সেটি আর কেনাবেচার বস্তু থাকে না। অর্থনৈতিক দক্ষতার প্রচলিত ধারণা থেকে দেখলে এটি একধরনের সীমাবদ্ধতা মনে হতে পারে। কারণ, সম্পদকে একটি নির্দিষ্ট ব্যবহারের মধ্যে স্থায়ীভাবে আটকে দেওয়া হয় এবং বাজারের পরিবর্তিত চাহিদা অনুযায়ী তার পুনর্বিন্যাসের সুযোগ থাকে না। কুরান এই অনমনীয়তাকেই ওয়াকফ ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতার একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তবে একই বৈশিষ্ট্যের আরেকটি দিকও আছে। সম্পদ যখন আর বাজারযোগ্য থাকে না, তখন রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় সেটিকে সহজে বাজেয়াপ্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, তার ওপর কোনো ব্যক্তিগত মালিকের দাবি আর অবশিষ্ট থাকে না।

দ্বিতীয়ত, ওয়াকফ একটি চিরস্থায়ী আইনগত সত্তা সৃষ্টি করে। প্রতিষ্ঠাতা মারা যেতে পারেন, তাঁর উত্তরাধিকারীরা বিলুপ্ত হতে পারেন, রাজবংশ বদলে যেতে পারে, এমনকি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিচয়ও পাল্টে যেতে পারে; কিন্তু ওয়াকফের আইনি সত্তা বহাল থাকে। মুতাওয়াল্লি পরিবর্তিত হন, প্রশাসনিক কাঠামো বদলায়, কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি নিজে টিকে থাকে। এই স্থায়িত্ব ওয়াকফের আইনি গঠনের মধ্যেই নিহিত।

এই দুটি বৈশিষ্ট্য একত্রে বিবেচনা করলে ওয়াকফকে বোঝার একটি ভিন্ন পথ খুলে যায়। ধর্মীয় সওয়াব লাভ অবশ্যই এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা ছিল, তবে প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ওয়াকফের কাজ আরও গভীর। এটি এমন এক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে কোনো সম্পদকে ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ থেকে সরিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ ওয়াকফ একটি মৌলিক রূপান্তর ঘটায়। ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে এমন একধরনের সম্পদে পরিণত করে, যা আর পুরোপুরি ব্যক্তিগত নয়, আবার রাষ্ট্রীয়ও নয়। এটি তৃতীয় ধারার আরেকটি প্রতিষ্ঠান।

১৩৪২ সালে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ দিল্লি সালতানাতের আনুগত্য ত্যাগ করে বাংলাকে একটি স্বাধীন সালতানাতে রূপান্তরিত করার পর বাংলার রাজনৈতিক অর্থনীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। বাংলা আর দূরবর্তী সাম্রাজ্যের কোনো সীমান্ত-প্রদেশ রইল না; নিজেই হয়ে উঠল একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক কেন্দ্র। রিচার্ড ইটন ‘এনসাইক্লোপিডিয়া ইরানিকা’র বাংলা-বিষয়ক নিবন্ধে দেখিয়েছেন, স্বাধীনতার পরও বাংলার তিনটি মৌলিক প্রাতিষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্য ধারাবাহিকভাবে বিকশিত হতে থাকে—পারস্য-প্রভাবিত রাজকীয় সংস্কৃতি, দাস-নির্ভর প্রশাসনিক কাঠামো এবং উচ্চমাত্রায় বাণিজ্যিকীকৃত ও মুদ্রাভিত্তিক অর্থনীতি। এই তিনটি উপাদানই ওয়াকফের বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। রাজকীয় সংস্কৃতিতে ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছিল রাজনৈতিক বৈধতার ভাষা; অন্যদিকে নগদ অর্থনীতি ও বাণিজ্যের সম্প্রসারণ দীর্ঘস্থায়ী সম্পদ সৃষ্টি এবং তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছিল।

তবে ওয়াকফের বিস্তারকে কেবল ধর্মীয় অনুপ্রেরণার ফল হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত চরিত্র বোঝা যায় না। বাংলার পূর্বাঞ্চলে কৃষির বিস্তার নিয়ে রিচার্ড ইটনের গবেষণা দেখায়, মধ্যযুগে নতুন বসতি গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সুফি খানকাহগুলো প্রায়ই কেন্দ্রের ভূমিকা পালন করত। বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে কৃষিজমি তৈরি হতো, সেই জমিকে ঘিরে বসতি গড়ে উঠত, আর বসতির সঙ্গে যুক্ত হতো বাজার, মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এই পুরো প্রক্রিয়াকে স্থায়ী ভিত্তি দেওয়ার জন্য শাসকেরা সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে রাজস্বমুক্ত জমি ওয়াকফ করে দিতেন। ফলে একটি খানকাহ কেবল ইবাদত-বন্দেগির স্থান থাকত না; ধীরে ধীরে তা একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক কেন্দ্রেও পরিণত হতো।

এই প্রেক্ষাপটে ওয়াকফ ছিল রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক কৌশলও। নতুন ভূখণ্ডে সরাসরি প্রশাসনিক অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিবর্তে শাসকেরা স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য ধর্মীয় নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করতেন। সুফিরা সামাজিক আস্থা ও ধর্মীয় বৈধতা নিয়ে আসতেন, আর রাষ্ট্র তাদের দিত ভূমি ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। এর ফলে নতুন কৃষি অঞ্চলকে রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা সহজ হতো। বাগেরহাটে খান জাহান আলীর কর্মকাণ্ড কিংবা সিলেটে শাহ জালালের দরগাহকে ঘিরে গড়ে ওঠা জনপদ এই বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ারই অংশ।

ওয়াকফ কারা প্রতিষ্ঠা করতেন, সে প্রশ্নের উত্তরও আমাদের এই রাজনৈতিক যুক্তির দিকে নিয়ে যায়। অবশ্যই সুলতানেরা ছিলেন সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক। তবে তাঁরা একা ছিলেন না। মাহবুব আলমের গবেষণায় দেখা যায়, পান্ডুয়ার খানকাহ ও মাদরাসাগুলোর জন্য কেবল একজন শাসক নন, বরং বিভিন্ন সময়ে একাধিক সুলতান, আমির, সামরিক কর্মকর্তা এবং উচ্চপদস্থ অভিজাত পর্যায়ক্রমে ওয়াকফ অনুদান দিয়েছেন। অর্থাৎ একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ এককালীন দানের মাধ্যমে গড়ে ওঠেনি; বরং বহু প্রজন্মের ধারাবাহিক পৃষ্ঠপোষকতার মধ্য দিয়ে বিস্তৃত হয়েছে।

এই ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ফল ছিল। কোনো একটি ওয়াকফ একক শাসকের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না; ফলে কোনো রাজবংশের পতনের সঙ্গে তার অস্তিত্বও বিলীন হয়ে যেত না। নতুন শাসক পূর্বসূরির দেওয়া ওয়াকফ বাতিল করার পরিবর্তে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা পুনর্নিশ্চিত করতেন, অনেক সময় নতুন সম্পত্তিও যুক্ত করতেন। কারণ, তত দিনে প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় সমাজে এমনভাবে প্রোথিত হয়ে যেত যে তাকে অস্বীকার করা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যয়বহুল ছিল।

পনেরো শতকের রাজনৈতিক অস্থিরতা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে। ইলিয়াস শাহি শাসনের দুর্বলতার সুযোগে রাজা গণেশ ক্ষমতা দখল করেন। পরে তাঁর পুত্র যদু ইসলাম গ্রহণ করে জালালুদ্দিন মুহাম্মদ শাহ নামে সিংহাসনে আরোহণ করেন। মাহবুব আলম দেখিয়েছেন, শায়খ নূর কুতুব আলমের সমর্থন ও দুআ এই ক্ষমতা পরিবর্তনের পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। সিংহাসনে বসার পর জালালুদ্দিন সেই খানকাহ ও মাদরাসার জন্য নতুন ওয়াকফ অনুদান দেন। ওয়াকফ সেই বৈধতার প্রাতিষ্ঠানিক ভাষায় পরিণত হয়েছিল।

একই ধারা অন্যত্রও দেখা যায়। মাহবুব আলমের গবেষণা অনুযায়ী, ১৪৭৯ খ্রিষ্টাব্দে (৮৮৪ হিজরি) সুলতান ইউসুফ শাহ শাহ জালালের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত একটি দানিশগাহ (উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয়) ও মসজিদের জন্য ওয়াকফ প্রতিষ্ঠা করেন। সমসাময়িক শিলালিপি থেকে জানা যায়, এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা আসত। লক্ষণীয় বিষয় হলো, শাহ জালালের মৃত্যুর বহু বছর পরও তাঁর নামকে কেন্দ্র করে নতুন ওয়াকফ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। অর্থাৎ ওয়াকফ কেবল বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান সংরক্ষণ করত না; প্রতিটি নতুন শাসকও এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেকে পূর্ববর্তী ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করতেন।

এই সমগ্র প্রবণতার সবচেয়ে পরিণত রূপ দেখা যায় পান্ডুয়ায়, যেখানে সুলতানি বাংলার দুটি বৃহত্তম সুফি-প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে এমন ওয়াকফ এস্টেট গড়ে ওঠে, যা কয়েক শতাব্দী ধরে প্রায় অবিচ্ছিন্নভাবে টিকে থাকে।

সুলতানি বাংলার রাজধানী পান্ডুয়া ছিল এই প্রাতিষ্ঠানিক ধারার সবচেয়ে পরিণত উদাহরণ। এখানে দুটি বড় সুফি খানকাহকে ঘিরে যে ওয়াকফ এস্টেট গড়ে উঠেছিল, তার ইতিহাস সাম্প্রতিক গবেষণায় বিস্তারিতভাবে পুনর্গঠিত করেছেন সালিম জাওয়িদ। একটি ছিল শায়খ জালালউদ্দিন তাবরিজির খানকাহ, যা পরবর্তীকালে বড়ি দরগাহ নামে পরিচিত হয়; অন্যটি শায়খ নূর কুতুব আলমের খানকাহ, যা পরিচিতি পায় ছোটি দরগাহ নামে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দুই প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি এতটাই বিস্তৃত হয় যে তাদের ওয়াকফ এস্টেটই স্বতন্ত্র পরিচয় লাভ করে—একটি বাইশ হাজারী, অন্যটি ছয় হাজারী নামে।

এই নামগুলোর মধ্যেই একটি প্রশাসনিক ইতিহাস লুকিয়ে আছে। সম্ভবত বার্ষিক আয় বা সম্পত্তির পরিমাণের ভিত্তিতে এই এস্টেটগুলোর পরিচয় নির্ধারিত হতো। অর্থাৎ এগুলো নিছক ধর্মীয় তীর্থস্থান ছিল না; বরং সুসংগঠিত অর্থনৈতিক সম্পদ-ব্যবস্থাও ছিল।

জাওয়িদের গবেষণায় দেখা যায়, এই ওয়াকফগুলোর ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ইলিয়াস শাহি শাসকদের দেওয়া রাজস্বমুক্ত জমির ওপর। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাদের ইতিহাস সুলতানি যুগেই থেমে থাকেনি। একই ওয়াকফ-সনদ পরবর্তীকালে মুঘল সম্রাটরা পুনর্নিশ্চিত করেছেন, বাংলার নবাব নাজিমরা বহাল রেখেছেন, এমনকি ব্রিটিশ প্রশাসনের অধীনেও এর আইনি স্বীকৃতি বজায় ছিল। অর্থাৎ একটি প্রতিষ্ঠান পরপর তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়েও তার অস্তিত্ব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

এই দীর্ঘস্থায়িত্ব কেবল ধর্মীয় মর্যাদার কারণে সম্ভব হয়নি। কয়েক শতাব্দীর মধ্যে পান্ডুয়ার এই দুই খানকাহ স্থানীয় সমাজের গভীরে প্রোথিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। তাদের সম্পত্তি থেকে শিক্ষা, ধর্মীয় কার্যক্রম, অতিথিসেবা এবং অন্যান্য সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। ফলে কোনো নতুন শাসকের জন্য এই প্রতিষ্ঠান বাতিল করা মানে কেবল কিছু জমি বাজেয়াপ্ত করা নয়; বরং একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সামাজিক ব্যবস্থার সঙ্গে সংঘাত তৈরি করা। রাজনৈতিক বিচক্ষণতার দিক থেকেও তাই পুরোনো ওয়াকফ বহাল রাখাই ছিল অধিক যুক্তিযুক্ত।

রিচার্ড ইটনের পর্যবেক্ষণ এই ব্যাখ্যাকে আরও দৃঢ় করে। তাঁর মতে, বাংলার বহু ভূমি-অনুদান একই সঙ্গে রাজকীয় মঞ্জুরি এবং ওয়াকফ—উভয় বৈশিষ্ট্য বহন করত। অর্থাৎ এগুলো রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠলেও রাষ্ট্রের দৈনন্দিন আর্থিক কাঠামো থেকে পৃথক একটি স্থায়ী সম্পদভিত্তি সৃষ্টি করত। এখানেই ওয়াকফের প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি নিহিত ছিল। এটি রাষ্ট্রের ভেতরে থেকেও রাষ্ট্রের বাইরে একটি দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক অবকাঠামো তৈরি করেছিল, যা রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের পরও নিজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়।

এই কারণেই পান্ডুয়ার বাইশ হাজারী ও ছয় হাজারী ওয়াকফকে কেবল দুটি ধর্মীয় এস্টেট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এগুলো ছিল এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে ভূমি, উদ্বৃত্ত, বৈধতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা—চারটিই একসূত্রে গাঁথা ছিল। আর ঠিক এই কারণেই ওয়াকফ মধ্যযুগীয় বাংলায় শুধু ধর্মীয় অনুদানের ভাষা ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘস্থায়ী প্রতিষ্ঠান নির্মাণেরও একটি স্বতন্ত্র প্রযুক্তি।

ওয়াকফ কীভাবে কাজ করত?

পান্ডুয়ার ওয়াকফ-সনদগুলোর দিকে তাকালেই সেই সুবিন্যস্ত অর্থনৈতিক কাঠামোর ছবিটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে। সালিম জাওয়িদের গবেষণায় উঠে আসা মুঘল আমলের একটি সনদের কথাই ধরা যাক। সেখানে দেখা যায়, বাইশ হাজারী ওয়াকফের অধীন মহলগুলোর আবাদি জমির পাশাপাশি আশপাশের জঙ্গল আর নদীর ওপরও মুতাওয়াল্লির অধিকার স্বীকার করে নেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ ওয়াকফ বলতেই যে শুধুই চাষবাসের জমি, ব্যাপারটা তা নয়। বনাঞ্চল, জলাশয়, মাছ ধরা, এমনকি নৌপথ ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও ছিল এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। তখনকার দিনের বাংলায় এসবের প্রতিটিই ছিল আয়ের খাঁটি ও স্বীকৃত উৎস।

এই আয় আবার খরচ হতো কোথায়? সমসাময়িক নথিপত্রে কিন্তু সেই হিসাবও পাওয়া যায়। ১৯২১ সালে অধ্যাপক এ. হাকিম মুঘল আমলের যে সনদটি অনুবাদ করেন, তাতে মুতাওয়াল্লির দায়িত্ব একদম মেপে মেপে ঠিক করে দেওয়া আছে। ওয়াকফের আয় খরচ করতে হবে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, মসজিদ ও খানকাহর আলো জ্বালানো, স্থাপনার দেখভাল ও মেরামত এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দরকারি সব খাতে। কেবল তা-ই নয়, নানা ঐতিহাসিক সূত্র থেকে এটাও জানা যায় যে এই খানকাহগুলো থেকে প্রতিনিয়ত ভুখা মানুষকে খাবার দেওয়া হতো, পথচলতি মানুষ পেত আতিথ্য, আর শিক্ষার্থীরা পেত থাকার জায়গা ও পড়াশোনা করার সুযোগ। জাওয়িদ তো এ-ও উল্লেখ করেছেন যে ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকেই শায়খ জালালউদ্দিন তাবরিজির খানকাহতে নিয়মিত নিখরচায় খাবার বিতরণ আর একধরনের চিকিৎসাসেবাও চালু ছিল।

সোজা কথায়, ওয়াকফের অর্থনীতি চলত এক অবিরাম চক্রের মধ্য দিয়ে। করমুক্ত সম্পত্তি থেকে যে বাড়তি আয় বা উদ্বৃত্ত আসত, তা এসে জমত ওয়াকফের তহবিলে। আর সেখান থেকেই সেই অর্থ আবার বিলিয়ে দেওয়া হতো সমাজের কাজে—শিক্ষা, ধর্মীয় কর্মকাণ্ড, অবকাঠামো সামলানো আর সাধারণ মানুষের কল্যাণে। অর্থাৎ সম্পদ এখানে কারও ব্যক্তিগত ভোগবিলাসে তলিয়ে না গিয়ে স্থায়ী এক প্রাতিষ্ঠানিক সেবায় রূপ নিত।

সেই বিচারে ওয়াকফ কেবল স্থাবর কোনো সম্পত্তি ছিল না; এটি ছিল উদ্বৃত্ত অর্থকে সমাজের স্থায়ী প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার এক জ্যান্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।

ওয়াকফ কেন এত দীর্ঘস্থায়ী ছিল?

মধ্যযুগীয় ভারতে তো রাজারা নানা রকমের ভূমি-অনুদান দিতেন। যেমন—ইনাম, সুয়ুরঘাল, মদদ-ই-মাআশসহ আরও কত কী! কিন্তু অধিকাংশ অনুদান সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেলেও ওয়াকফ কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে রইল?

উত্তরটা লুকিয়ে আছে ওয়াকফের নিজস্ব আইনি কাঠামোর ভেতরেই।

জাওয়িদের গবেষণা তুলে ধরে যে, সাধারণ ভূমি-অনুদানগুলো মূলত শর্তসাপেক্ষ হতো। অনুদান পাওয়া ব্যক্তির মৃত্যুর পর সেই অনুদান নতুন করে নবায়ন করতে হতো, এমনকি শাসক চাইলে যেকোনো সময় তা কেড়েও নিতে পারতেন। কিন্তু ওয়াকফের ক্ষেত্রে ঘটনা ভিন্ন; সম্পত্তির মালিকানা স্থায়ীভাবে বাঁধা পড়ে যেত প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে। ফলে ক্ষমতার মসনদে নতুন কেউ এলে তাঁর সামনে দুটো পথ খোলা থাকত—হয় একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে এক ঝটকায় গুঁড়িয়ে দেওয়া, নয়তো তার আইনি ধারাবাহিকতাকে মেনে নেওয়া। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, প্রায় সব শাসকই দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছেন।

সম্পূর্ণ ভিন্ন তিনটি রাষ্ট্রব্যবস্থার থাবা পাশ কাটিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের এই যে মাথা উঁচু করে টিকে থাকা, তা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়।

পান্ডুয়ার বাইশ হাজারী ও ছয় হাজারী ওয়াকফ সেই পরম বাস্তবতারই জ্বলন্ত উদাহরণ। একই সনদ সুলতানি আমলে বলবৎ ছিল, পরে মুঘলরা এসে তা বহাল রেখেছে, নবাব নাজিমরাও মেনে নিয়েছেন, এমনকি ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনাতেও যার আইনি ভিত্তিকে স্পর্শ করা হয়নি। সম্পূর্ণ ভিন্ন তিনটি রাষ্ট্রব্যবস্থার থাবাকে পাশ কাটিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের এই যে মাথা উঁচু করে টিকে থাকা কিন্তু কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। বরং এটা ছিল ওয়াকফের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক নকশারই অসামান্য সাফল্য।

তবে এই স্থায়িত্বের পরমায়ু কিন্তু চিরন্তন হয়নি। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ধাক্কায় ব্রিটিশ রাজস্বনীতি বহু ওয়াকফ এস্টেটের করমুক্ত সুবিধা বাতিল করে দেয়। প্রথমবারের মতো ওয়াকফ এমন এক নির্দয় রাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড়ায়, যা এই নিষ্কর সম্পত্তিগুলোকে রাজনৈতিক বা সামাজিক সম্পদ না ভেবে স্রেফ নিজেদের কর আদায়ের পথের কাঁটা মনে করত। মূলত সেখান থেকেই ঘটে ওয়াকফ ব্যবস্থার দীর্ঘ ক্ষয় আর অবক্ষয়ের সূচনা।

ওয়াকফকৃত সম্পদের সামাজিকীকরণ

এই জায়গায় এসে ওয়াকফকে স্রেফ একটা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা সত্যি কঠিন হয়ে পড়ে।

ওয়াকফের মাধ্যমে যে সম্পত্তি গঠিত হয়, তার নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিগত মালিক থাকে না; আবার রাষ্ট্রও এর ওপর মালিকানা দাবি করতে পারে না। এটি এমন এক সামাজিক সম্পদ, যার সুফল বা ব্যবহার একটা নির্দিষ্ট সামাজিক উদ্দেশ্যের জন্যই চিরতরে বেঁধে দেওয়া হয়। ব্যক্তিও এর মালিক নন, রাষ্ট্রও মালিক নয়; এই দুয়ের ক্ষমতার বাইরে দাঁড়িয়ে সম্পত্তিটি স্রেফ একটা প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যকে সেবা দিয়ে যায়।

তিমুর কুরানের ভাষায়, এই যে দীর্ঘমেয়াদি ও অনড় প্রতিশ্রুতি—এটাই ছিল ওয়াকফের আসল শক্তি। দাতা অন্তত এই বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকতেন যে তাঁর সম্পত্তি আগামী দিনেও সেই একই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে। একই সঙ্গে সমাজও নিশ্চিত হয় যে শিক্ষা, ধর্মীয় সেবা, খাদ্য বিতরণ কিংবা খানকাহর মতো প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তির ইচ্ছা বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করবে না।

সহজ ভাষায়, ওয়াকফ হলো সম্পদকে সামাজিকভাবে কাজে লাগানোর এক অভাবনীয় কৌশল। ব্যক্তির হাতে জমতে থাকা বাড়তি অর্থ বা সম্পত্তিকে এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিতে বদলে দেওয়া, যা বছরের পর বছর ধরে সমাজেরই বৈচিত্র্যময় অভাব মেটাবে—এটাই ছিল এর পেছনের খাঁটি দর্শন।

কিন্তু একটা সমাজ কেন তার মূল্যবান সম্পদের একটা বড় অংশকে কেনাবেচার বাজারের বাইরে নিয়ে এক জায়গায় স্থায়ীভাবে আটকে রাখবে? অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ বা দক্ষতার চোখে দেখলে এটা আপাতদৃষ্টিতে খটকা তৈরি করতে পারে, মনে হতে পারে অযৌক্তিক। কিন্তু মধ্যযুগীয় বাংলায় ঠিক এই কাজটাই ঘটেছে নিয়ম করে। আরও অবাক করা বিষয় হলো, এই ব্যবস্থা কেবল টিকে থাকেনি, বরং দিন দিন এর বিস্তার আরও ডালপালা মেলেছে।

এই ধাঁধার জট খুলতে হলে আমাদের সম্পদের হিসাব কিংবা কার্যকারিতার অঙ্ক থেকে একটু সরে এসে ‘অনিশ্চয়তা’র জায়গায় চোখ রাখতে হবে। কারণ, ওয়াকফের প্রধানতম কাজটা কেবল সম্পদ টিকিয়ে রাখার মধ্যে ছিল না; বরং সমাজজুড়ে যে ঝুঁকি আর অনিশ্চয়তার নিত্য আনাগোনা ছিল, তাকে দীর্ঘমেয়াদে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া ও সামলে নেওয়ার কাজটাই করত এই ব্যবস্থা।

ওয়াকফ ও অনিশ্চয়তার বাটোয়ারা

এবার একটি দৃশ্য কল্পনা করুন।

মধ্যযুগীয় বাংলার একটি গ্রামে একজন কৃষক হঠাৎ মারা গেলেন, তাঁর পরিবারে কোনো উপার্জনক্ষম সদস্য রইল না। কিংবা ধরা যাক, একজন মেধাবী কিন্তু দরিদ্র ছাত্র তার পড়ালেখা চালাতে পারছে না। কিংবা দূরদেশ থেকে আসা কোনো পথিক অজানা জনপদে আশ্রয়হীন হয়ে পড়লেন। আবার ধরুন, কোনো এক গ্রাম বন্যা বা মহামারির কবলে পড়ে সাময়িকভাবে অচল হয়ে গেল।

এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি নির্মম সত্য দেখা যাচ্ছে। তা হলো, ব্যক্তির ওপর হঠাৎ নেমে আসা একধরনের অনিশ্চয়তা, যা সামলানোর ক্ষমতা তাঁর একার নেই।

আজকের দিনে এই ধরনের বিপদ মোকাবিলার জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, স্বাস্থ্যবিমা কিংবা রাষ্ট্রীয় ত্রাণ ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু মধ্যযুগীয় বাংলার মতো সমাজে, যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের সামর্থ্য ছিল সীমিত এবং পরিবেশগত ঝুঁকি ছিল নিত্যদিনের বিষয়—সেখানে এই বিপদ কাঁধে নেওয়ার দায় কার?

ওয়াকফের অর্থনৈতিক প্রবাহের ছবিটা এখানেই নতুন এক অর্থ পায়।

জমি রাজস্ব ওয়াকফ তহবিল সামাজিক সেবা

এই পুরো চক্রটি এমন এক স্থায়ী, পূর্বনির্ধারিত এবং ক্ষমতার রদবদল থেকে মুক্ত আয়ের উৎস গড়ে তুলত, যা প্রতিটি সংকটে তৎক্ষণাৎ সক্রিয় হয়ে উঠত। কারণ, এর অস্তিত্ব কোনো একক ব্যক্তির ইচ্ছে বা শাসকের মর্জির ওপর ঝুলে ছিল না। শায়খ জালালউদ্দিন তাবরিজির খানকাহ থেকে যে নিয়মিত লঙ্গরখানা এবং বিমারিস্তান বা চিকিৎসাসেবা চলত, তা মূলত তখনকার দিনের এক প্রাথমিক সামাজিক নিরাপত্তা বলয় হিসেবেই কাজ করত। কৃষক পরিবার হারালে, ছাত্র নিঃস্ব হলে কিংবা পথিক আশ্রয়হীন হয়ে পড়লে সংকটের সেই ধাক্কা আর স্রেফ ব্যক্তির ঘাড়েই গিয়ে পড়ত না; ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান সেই আঘাতের বড় একটা অংশ নিজে শুষে নিত।

এই পুরো প্রক্রিয়াকে আমরা এভাবে সাজাতে পারি:

উদ্বৃত্ত (ব্যক্তির দান করা সম্পদ) স্থায়ী প্রতিষ্ঠান (ওয়াকফ) সামাজিক বাফার (নিয়মিত সেবা প্রবাহ) অনিশ্চয়তা-বণ্টন (ব্যক্তির ঝুঁকি সমাজের সঙ্গে ভাগ হওয়া)

সুলতানি বাংলার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়ে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল—অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানকে স্রেফ ডাগলাস নর্থের ‘প্রাতিষ্ঠানিক আচরণবিধি’ হিসেবে না দেখে অনিশ্চয়তা ভাগ করে নেওয়ার একটা ব্যবস্থা হিসেবে দেখা দরকার—ওয়াকফ তারই সবচেয়ে স্পষ্ট ও গোছানো রূপ। ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থায় যেমন ফলন কমলে রাষ্ট্রের ভাগের পাওনাও কমে যেত (যার অর্থ প্রকৃতির ঝুঁকির একটা অংশ রাষ্ট্র নিজে বইত), ঠিক তেমনি ওয়াকফ ব্যবস্থাতেও ব্যক্তিগত জীবনের হঠাৎ আসা বিপদের কিছুটা ভার সমাজ নিজের কাঁধে তুলে নিত। একটার লক্ষ্য ছিল পরিবেশগত ঝুঁকি ভাগ করা, অন্যটির লক্ষ্য ব্যক্তিগত ও সামাজিক ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়া। তবে দুটোর ভেতরের আসল প্রাতিষ্ঠানিক দর্শন একই।

এই তত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা কিন্তু কেবল ইতিহাসের বইতে আটকে নেই। আজকের বাংলাদেশেও এমন এক চরম অনিশ্চয়তা প্রায় প্রতিটি পরিবারকে তাড়া করে ফেরে, যা সামলানোর মতো স্থায়ী কোনো সামাজিক সুরক্ষা কবচ নেই। আর তা হলো আকস্মিক চিকিৎসার খরচ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২২ সালে পকেটের টাকায় চিকিৎসা খরচ চালাতে গিয়ে দেশের প্রায় ৬১ লাখ মানুষ—যা মোট জনসংখ্যার ৩.৭ শতাংশ—দারিদ্র্যসীমার নিচে তলিয়ে গেছেন। ক্যানসার আর কোভিডের মতো রোগে এই খরচের ধস সবচেয়ে বেশি ছিল বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। মূল কারণ একটাই, আমাদের স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বাজেট সামান্যই; ফলে চিকিৎসার পুরো আর্থিক ঝুঁকিটাই একদম একা পরিবারকে বইতে হয়, যা ভাগ করে নেওয়ার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পথ খোলা নেই।

এই সংকটের সঙ্গে সাত শতাব্দী আগের শায়খ জালালউদ্দিন তাবরিজির খানকাহর দিকে তাকালে এক করুণ বৈসাদৃশ্য চোখে পড়ে। পান্ডুয়ায় সেদিন ওয়াকফ-ভিত্তিক একটা প্রতিষ্ঠান নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিত, যার খরচ আসত রাজক্ষমতার রদবদলমুক্ত, স্থায়ীভাবে সুরক্ষিত এক সম্পদ থেকে। আর আজ আমাদের দেশে ওয়াকফ এস্টেটগুলো অকার্যকর পড়ে আছে। যেগুলো কোনোমতে সচল, সেগুলোর কাজও আটকে আছে স্রেফ মসজিদ-মাদরাসা মেরামতেই। অথচ স্বাস্থ্যসেবা বা বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানোর মতো সামাজিক ভূমিকা পালনে ওয়াকফের সেই দুর্দান্ত সম্ভাবনা আজ পুরোপুরি অব্যবহৃত। অথচ ঐতিহাসিকভাবে এটাই ছিল ওয়াকফের মূল প্রাণ।

ওয়াকফকে যদি স্রেফ একটা ধর্মীয় পুণ্যকর্ম মনে করা হয়, তবে তার গুরুত্ব ওই অতীত স্মৃতির মাঝেই থমকে থাকবে। কিন্তু একে যদি অনিশ্চয়তা ভাগ করে নেওয়ার এক মজবুত ব্যবস্থা হিসেবে দেখা যায়—যা ব্যক্তির উদ্বৃত্তকে স্থায়ী সামাজিক সম্পদে বদলে দেয় এবং সমাজের দুর্যোগ শুষে নেয়—তাহলে এটি আর স্রেফ ইতিহাসের পাতা বা স্মারক হয়ে থাকে না; বরং আজকের বড় বড় সংকট সমাধানের এক বাস্তবমুখী প্রাতিষ্ঠানিক পথ হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়।

তথ্যসূত্র

  1. Rahman, M. (2025, July 8). বাংলাদেশে ওয়াকফ সম্পদের নতুন চ্যালেঞ্জ. কালবেলা. kalbela.com
  2. Government of Bangladesh. (1962). The Waqfs Ordinance, 1962 (Ordinance No. I of 1962). Bangladesh Code. bdlaws.minlaw.gov.bd
  3. Eaton, R. M. (1993). The rise of Islam and the Bengal frontier, 1204–1760. University of California Press.
  4. Kuran, T. (2001). The provision of public goods under Islamic law: Origins, impact, and limitations of the waqf system. Law & Society Review, 35(4), 841–897. doi.org/10.2307/3185418
  5. Eaton, R. M. (1989). Bengal. Encyclopaedia Iranica, IV(2), 137–143. iranicaonline.org
  6. Alam, M. (2023, November). The quest of waqfs during the Muslims rule in Bengal. The Academic: International Journal of Multidisciplinary Research, 1(4), 107–119. theacademic.in
  7. Zaweed, S. (2021). The waqf estates of Pandua: Historical analysis (from fifteenth to twentieth centuries). Indian Historical Review, 48(2), 273–291. doi.org/10.1177/03769836211052103
  8. The Business Standard. (2024, July 15). Out-of-pocket spendings for healthcare push 61 lakh into poverty in 2022: BIDS. tbsnews.net