আমার মাটি ও মানুষকে ভালোবাসতে জাতীয়তাবাদ দরকার নেই

আমি এই অঞ্চলের মাটি ও মানুষকে ভালোবাসি। কিন্তু এই ভালোবাসার জন্য কি আমাকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ গ্রহণ করতে হবে?
ইচ্ছাকৃতভাবেই ‘দেশ’ শব্দটি দিয়ে শুরু করছি না। কারণ ‘দেশ’ বলতে আমরা আজ যে রাজনৈতিক সীমানাকে বুঝি, সেটি ইতিহাসের কোনো চিরন্তন সত্য নয়। এটি একটি আধুনিক রাজনৈতিক বিন্যাস।
দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে আজ যে সীমারেখাগুলোকে আমরা স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিয়েছি, তার বড় অংশই ঔপনিবেশিক রাজনীতির উত্তরাধিকার। কোনো এক সময় ক্ষমতাবানরা মানচিত্রে দাগ টেনেছিল। সেই দাগ আজ নাগরিকত্ব নির্ধারণ করে, পাসপোর্ট নির্ধারণ করে, এমনকি অনেক সময় আমাদের নৈতিক কল্পনাকেও নির্ধারণ করে।
আমি সেই সীমারেখা আঁকিনি। আমার পূর্বপুরুষও আঁকেননি। কিন্তু আমি এই মাটিকে ভালোবাসি। কারণ আমার ভালোবাসার উৎস কোনো মানচিত্র নয়। আমার ভালোবাসার উৎস স্বজাত্যবোধ। আমি এই ভাষায় চিন্তা করি। এই অঞ্চলের মানুষ, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং স্মৃতির মধ্যে বড় হয়েছি। এই সমাজের সাফল্যে আমি আনন্দ পাই, ব্যর্থতায় কষ্ট পাই। রাষ্ট্র আমাকে নাগরিকত্ব দিয়েছে, কিন্তু এই মাটির সঙ্গে আমার সম্পর্ক রাষ্ট্র সৃষ্টি করেনি।
এই কারণেই আমি দেশপ্রেম এবং জাতীয়তাবাদকে এক জিনিস মনে করি না।
দেশপ্রেম এক জিনিস, জাতীয়তাবাদ আরেক
আমার কাছে দেশপ্রেম একটি মানবিক অনুভূতি। জাতীয়তাবাদ একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ। এই দুইয়ের মধ্যে সম্পর্ক থাকতে পারে, কিন্তু তারা সমার্থক নয়। মানুষ জাতীয়তাবাদের কারণে নিজের ভূমিকে ভালোবাসতে শেখেনি। জাতীয়তাবাদের জন্মের বহু আগে মানুষ নিজের পরিবার, অঞ্চল, ভাষা এবং সমাজকে ভালোবেসেছে। নিজের মানুষকে রক্ষা করার প্রবৃত্তি মানুষের স্বাভাবিক সামাজিক অভিজ্ঞতা। আধুনিক জাতীয়তাবাদের কিছু রূপ পরে এসে সেই অনুভূতিকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রকল্পে রূপ দিয়েছে।
| স্বজাত্যবোধ / দেশপ্রেম | জাতীয়তাবাদ (রাজনৈতিক রূপ) | |
|---|---|---|
| প্রকৃতি | মানবিক অনুভূতি | রাজনৈতিক মতাদর্শ |
| উৎস | ভাষা, স্মৃতি, সমাজ ও জীবন্ত সম্পর্ক | মানচিত্র, নাগরিকত্ব ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো |
| বয়স | জাতিরাষ্ট্রের বহু আগে থেকেই বিদ্যমান | আধুনিক যুগের নির্মাণ |
| ন্যায়ের সঙ্গে সম্পর্ক | দায়িত্ব সৃষ্টি করে | অনেক সময় দায়িত্বকে একচোখা আনুগত্যে রূপান্তরিত করে |
ধরুন, একটি ভবনে আগুন লেগেছে। সেখানে আমার আপন ভাই এবং একজন অপরিচিত মানুষ আটকা পড়েছে। আমি যদি কেবল একজনকে বাঁচাতে পারি, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আমি আমার ভাইকে আগে বাঁচানোর চেষ্টা করব। এর অর্থ এই নয় যে আমি কোনো “ভ্রাতৃত্ববাদী মতাদর্শে” বিশ্বাস করি বা অন্য মানুষের জীবনকে মূল্যহীন মনে করি। বরং এটি একটি স্বাভাবিক মানবিক অগ্রাধিকার। এটি আসে নৈকট্য ও সম্পর্ক থেকে।
একইভাবে একজন বাঙালি যদি বিপদে পড়া একজন বাঙালির প্রতি বিশেষ টান অনুভব করেন, তাহলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাতীয়তাবাদ নয়। জাতীয়তাবাদ তখনই আসে, যখন জাতিকে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও নৈতিক পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, অথবা জাতির স্বার্থকে নীতিগতভাবে অন্য সব পরিচয় ও নৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো জনগোষ্ঠীর প্রতি স্বাভাবিক মমতা, সাংস্কৃতিক আত্মীয়তা বা অগ্রাধিকারবোধকে জাতীয়তাবাদ বলে চিহ্নিত করা ধারণাগতভাবে বিভ্রান্তিকর।
এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি। কারণ আমরা প্রায়ই ধরে নিই, আমি যদি আমার মাটি ও মানুষকে ভালোবাসি, তাহলে আমাকে অবশ্যই জাতীয়তাবাদী হতে হবে। যেন ভালোবাসার একমাত্র বৈধ ভাষা জাতীয়তাবাদ। অথচ ইতিহাস সে কথা বলে না। মানুষের স্বজাত্যবোধ জাতীয়তাবাদের চেয়ে অনেক পুরোনো। রাষ্ট্রের আগেও মানুষ ছিল, জাতিরাষ্ট্রের আগেও সমাজ ছিল, আর রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের আগেও মানুষ নিজের ভূমিকে আপন বলে চিনত।
কল্পিত সম্প্রদায় এবং তার সীমা
পলিটিকাল থিওরিস্ট বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন তাঁর Imagined Communities গ্রন্থে জাতিকে বলেছেন an imagined political community। এখানে ‘imagined’ বলতে তিনি কোনো মিথ্যা কল্পনাকে বোঝাননি। তাঁর বক্তব্য ছিল, একই জাতির অধিকাংশ মানুষ কখনো একে অপরের সঙ্গে দেখা করবে না, তবুও তারা নিজেদের একই রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে কল্পনা করবে। এই কল্পনাই আধুনিক জাতির ভিত্তি।
কোনো কিছু সামাজিকভাবে নির্মিত হলেই তা অর্থহীন বা মিথ্যা হয়ে যায় না। ভাষা, সংস্কৃতি, আইন—অনেক মানবিক প্রতিষ্ঠানই নির্মিত, কিন্তু বাস্তব।
আমি অ্যান্ডারসনের এই বিশ্লেষণকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। কিন্তু এখানেই আমার প্রশ্ন শুরু হয়। যদি জাতি একটি রাজনৈতিকভাবে নির্মিত সম্প্রদায় হয়, তাহলে কেন সেটিই হবে আমার সর্বোচ্চ নৈতিক পরিচয়? কেন একটি সীমান্তরেখা ঠিক করবে কার জীবন আমার কাছে বেশি মূল্যবান? কেন একটি পাসপোর্ট নির্ধারণ করবে আমার ন্যায়বোধের সীমানা?
আমার মানুষের প্রতি আমার দায়িত্ব আছে। কারণ আমি তাদেরই একজন। তাদের দুঃখ আমাকে বেশি নাড়া দেয়, কারণ তাদের সঙ্গে আমার বাস্তব সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু দায়িত্ব আর নৈতিকতার পরিধি এক নয়। আমার মানুষের প্রতি বিশেষ দায়িত্ব থাকা মানে এই নয় যে অন্য মানুষের প্রতি অন্যায় করার অধিকার আমি পেয়ে গেলাম।
ধরা যাক, আগামীকাল বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বা মিয়ানমারের যুদ্ধ শুরু হলো। আমি কি চাইব বাংলাদেশের মানুষ নিরাপদ থাকুক? অবশ্যই চাইব। আমি কি চাইব আমার সমাজ ধ্বংসের শিকার না হোক? নিঃসন্দেহে চাইব। কিন্তু এই ইচ্ছা কি আমাকে বাধ্য করবে সীমান্তের ওপারের একজন নিরপরাধ শিশুর মৃত্যুকে উদ্যাপন করতে? অথবা একজন সাধারণ মানুষের ওপর বোমা পড়াকে শুধু ‘আমার রাষ্ট্রের স্বার্থ’ বলে নৈতিকভাবে সমর্থন করতে?
আমার উত্তর না।
কারণ আমার মানুষের প্রতি ভালোবাসা বাস্তব, কিন্তু অন্য মানুষের প্রতি ন্যায়বিচারের দায়ও বাস্তব। আমার কাছে ভালোবাসা কখনোই অন্যায় করার লাইসেন্স নয়। আর ঠিক এখান থেকেই জাতীয়তাবাদের সঙ্গে আমার বুদ্ধিবৃত্তিক বিরোধ শুরু হয়।
রাষ্ট্র যখন নৈতিকতার উৎস হয়ে ওঠে
আধুনিক জাতিরাষ্ট্র সম্পর্কে ওয়ায়েল হাল্লাকের সমালোচনার একটি দিক আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। তাঁর যুক্তি হলো, আধুনিক রাষ্ট্র কেবল একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়। এটি এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো, যা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের স্বার্থকে সর্বোচ্চ নৈতিক অগ্রাধিকারে পরিণত করে। রাষ্ট্র তখন শুধু আইন প্রণয়ন করে না, নাগরিকের নৈতিক কল্পনাকেও গড়ে তোলে। কোন জীবন বেশি মূল্যবান, কোন মৃত্যু গ্রহণযোগ্য, কোন সহিংসতা বৈধ, এসব প্রশ্নের উত্তরও অনেক সময় রাষ্ট্রই নির্ধারণ করতে শুরু করে।
হাল্লাক আরও দূর পর্যন্ত যান। Restating Orientalism-এ তিনি দেখিয়েছেন, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামোর ভিতরেই অন্য জনগোষ্ঠীর প্রতি ধ্বংসাত্মক সহিংসতার একটি প্রবণতা নিহিত থাকে। সম্প্রতি আল জাজিরার দোহা ডিবেইটসেও তিনি এই সমালোচনাই তুলে ধরেছেন।
এ কারণেই যুদ্ধের সময় প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্র একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করে। নিজের বোমা হয় ‘প্রয়োজনীয় সামরিক অভিযান’। প্রতিপক্ষের বোমা হয় ‘বর্বরতা’। নিজের নিহতরা হয় ‘শহিদ’ বা ‘বীর’। অন্য পক্ষের নিহতরা পরিণত হয় সংখ্যা বা পরিসংখ্যানে। রাষ্ট্রভেদে পতাকা বদলায়, ভাষা বদলায়, কিন্তু এই নৈতিক যুক্তির কাঠামো খুব একটা বদলায় না।
আমি বলছি না যে প্রতিটি জাতীয়তাবাদী মানুষ এই অবস্থান গ্রহণ করেন। কিংবা প্রতিটি রাষ্ট্র একই মাত্রায় এই নৈতিকতা অনুসরণ করে। আমার বক্তব্য আরও সীমিত, কিন্তু আরও মৌলিক। যখন রাষ্ট্র বা জাতিকে নৈতিকতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড বানানো হয়, তখন ন্যায়বিচার খুব সহজেই গৌণ হয়ে যেতে পারে। আমার আপত্তি সেই প্রবণতার বিরুদ্ধে।
আমি আমার মানুষের পাশে দাঁড়াই, কারণ আমি তাদেরই একজন। কিন্তু আমি অন্য নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়াই না, শুধু সে ‘অন্য রাষ্ট্রের’ নাগরিক বলে। একজন ভারতীয় শিশু, একজন মিয়ানমারের কৃষক, একজন নেপালি শ্রমিক কিংবা একজন ফিলিস্তিনি মায়ের জীবন তাদের পাসপোর্টের কারণে কম মূল্যবান হয়ে যায় না। মানুষের নৈতিক মর্যাদা রাষ্ট্রসীমা অতিক্রম করে।
অনেকে এখানে আপত্তি করতে পারেন। তাঁরা বলতে পারেন, বাস্তব রাজনীতি এত সরল নয়। রাষ্ট্রকে টিকে থাকতে হলে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যুদ্ধে নির্দোষ মানুষও মারা যায়। এই আপত্তির একটি অংশ সত্য। কিন্তু আমি রাষ্ট্র কী করে, সেই প্রশ্ন তুলছি না। আমি প্রশ্ন তুলছি, রাষ্ট্র যা করে, তা কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নৈতিক হয়ে যায়?
রাষ্ট্রের প্রয়োজন আর ন্যায়ের প্রয়োজন সবসময় এক জিনিস নয়।
ইতিহাসের বড় বড় অন্যায়গুলোও রাষ্ট্রের ভাষায় ‘জাতীয় নিরাপত্তা’, ‘রাষ্ট্রীয় স্বার্থ’, ‘সভ্যতা রক্ষা’ কিংবা ‘জাতীয় মর্যাদা’র নামে সংঘটিত হয়েছে। ঔপনিবেশিক আগ্রাসন, জাতিগত নিধন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি, এমনকি বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর নির্বিচার হামলাও প্রায় সবসময় কোনো না কোনো রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার ভাষায় বৈধতা পেয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে সব জাতিরাষ্ট্র একই রকম। বরং এর অর্থ হলো, রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে নৈতিকতার একমাত্র উৎস বানালে সেই নৈতিকতা সহজেই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
এই কারণেই আমি মনে করি, মানুষের প্রতি আমার ভালোবাসা বাস্তব, কিন্তু সেই ভালোবাসার ভাষা জাতীয়তাবাদ হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। আমি এই অঞ্চলের মাটি ও মানুষকে ভালোবাসি, কারণ তাদের সঙ্গে আমার জীবন্ত সম্পর্ক আছে। কিন্তু সেই সম্পর্ক আমাকে এমন কোনো নৈতিক অধিকার দেয় না, যার ভিত্তিতে আমি অন্য নিরপরাধ মানুষের প্রতি অন্যায়কে সমর্থন করতে পারি।
আমার কাছে স্বজাত্যবোধ দায়িত্ব সৃষ্টি করে।
কিন্তু জাতীয়তাবাদ, অন্তত তার কিছু রাজনৈতিক রূপ, প্রায়ই সেই দায়িত্বকে একচোখা আনুগত্যে রূপান্তরিত করে।
আসাবিয়্যা: ইসলামের নৈতিক আপত্তি
এ পর্যন্ত আমার আলোচনা ছিল রাজনৈতিক দর্শনের ভাষায়। কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে আমার কাছে আরও একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলাম কি আমাকে আমার মানুষের প্রতি ভালোবাসা শিখিয়েছে, নাকি আমার গোষ্ঠী বা জাতির প্রতি অন্ধ আনুগত্য শিখিয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ‘আসাবিয়্যা’ ধারণার কাছে ফিরে যেতে হয়। আরবি ‘আসাবিয়্যা’ শব্দটির সহজ অর্থ গোষ্ঠীগত পক্ষপাত। এমন এক আনুগত্য, যেখানে সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় বিচার না করে মানুষ শুধু ‘আমার লোক’ হওয়ার কারণে তার পক্ষ নেয়।
ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমায় আসাবিয়্যা ব্যবহার করেছেন সামাজিক সংহতি অর্থে, যে শক্তি সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলে। কাজেই আসাবিয়্যা মানেই খারাপ, এমন সরলীকরণ ঠিক নয়। ইসলামী নৈতিক আলোচনায় আসাবিয়্যার সমস্যা মূলত তখন, যখন গোষ্ঠীগত আনুগত্য সত্য ও ন্যায়ের ওপর প্রাধান্য পায়।
ইসলাম এই মানসিকতাকেই আঘাত করেছে। নিজের মানুষকে ভালোবাসা নয়, বরং নিজের মানুষ অন্যায় করলেও তার পক্ষে দাঁড়ানোর প্রবৃত্তিকেই ইসলাম জাহেলিয়াতের অবশিষ্ট বলে চিহ্নিত করেছে।
যে ব্যক্তি আসাবিয়্যার দিকে আহ্বান করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। যে আসাবিয়্যার জন্য যুদ্ধ করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। আর যে আসাবিয়্যার ওপর মৃত্যুবরণ করে, সেও আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।
সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৫১২১
এই বর্ণনার সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তবে এর মূল শিক্ষা আরও বহু সহিহ বর্ণনায় প্রতিফলিত হয়েছে। ইসলাম জন্মগত পরিচয়কে ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে দেয় না।
একবার সাহাবিদের মধ্যে গোত্রীয় পরিচয় নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হলে রাসূল ﷺ বলেছিলেন—
এটি ছেড়ে দাও। এটি দুর্গন্ধময়।
সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৫১৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৮৪
জাহেলি পরিচয়ের নামে বিভাজনকে তিনি এই ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আবার অন্য একটি বর্ণনায় দেখা যায়, কেউ যদি বংশীয় অহংকারে মত্ত হয়, তাহলে তাকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ভর্ত্সনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। [মুসনাদ আহমাদ]
ভাষাটি কঠিন, কিন্তু তার উদ্দেশ্য স্পষ্ট। ইসলাম মানুষের জন্মগত পরিচয়কে নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তি হতে দেয় না।
স্বজাত্যবোধ আর আসাবিয়্যা এক নয়
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। ইসলাম কখনো স্বজাত্যবোধ-এর বিরুদ্ধে নয়।
রাসূল ﷺ মক্কাকে ভালোবাসতেন। মক্কা ছেড়ে হিজরতের সময় তিনি বলেছিলেন, যদি তাঁর জাতি তাঁকে বের করে না দিত, তবে তিনি কখনো মক্কা ছেড়ে যেতেন না। [সুনান তিরমিজি, হাদিস ৩৯২৫; সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস ৩১০৮]
নিজের ভূমির প্রতি ভালোবাসা ইসলামে দোষ নয়। নিজের পরিবারকে ভালোবাসা দোষ নয়। নিজের ভাষা, সংস্কৃতি বা সমাজকে ভালোবাসাও দোষ নয়।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন এই ভালোবাসা ন্যায়বিচারের ওপর উঠে বসে।
ইসলাম আমাকে বলে, আমি আমার ভাইয়ের পাশে দাঁড়াব। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে আমি আমার ভাইয়ের অন্যায়েরও পাশে দাঁড়াব। বিখ্যাত হাদিসে সাহাবিরা যখন জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘মজলুমকে সাহায্য করা বুঝলাম, কিন্তু জালিমকে কীভাবে সাহায্য করব?’, রাসূল ﷺ উত্তর দিয়েছিলেন—
তাকে জুলুম করা থেকে বিরত রাখো।
সহিহ বুখারি, হাদিস ২৪৪৩
এখানেই ইসলামের নৈতিক বিপ্লব। আনুগত্যের অর্থ অন্ধ সমর্থন নয়। বরং ন্যায়ের দিকে ফিরিয়ে আনা।
ন্যায় জাতির চেয়ে বড়
এই জায়গাটিতেই আমি আধুনিক জাতীয়তাবাদের কিছু প্রবণতা এবং আসাবিয়্যার মধ্যে একটি সাদৃশ্য দেখি।
যখন কোনো মতাদর্শ আমাকে শেখায় যে ‘আমার রাষ্ট্র’ বলেই তার অন্যায়কে আমি কম অন্যায় মনে করব, যখন ‘আমার জাতি’ বলেই তাদের সহিংসতার জন্য আলাদা নৈতিক মানদণ্ড তৈরি করব, যখন সীমান্তের ওপারের নিরপরাধ মানুষের জীবন আমার কাছে কম মূল্যবান হয়ে উঠবে, তখন আমি ইসলামের আসাবিয়্যার সমালোচনার প্রতিধ্বনি শুনতে পাই।
আমি ইচ্ছাকৃতভাবেই বলছি, ‘কিছু প্রবণতা’। কারণ প্রতিটি জাতীয়তাবাদী ব্যক্তি এমন নন, প্রতিটি জাতীয়তাবাদের রূপও এক নয়। কিন্তু ইতিহাস আমাদের অন্তত এতটুকু শিক্ষা দেয় যে রাষ্ট্র ও জাতিকে যখন সর্বোচ্চ নৈতিক সত্যে পরিণত করা হয়, তখন ন্যায়বিচার প্রায়ই দ্বিতীয় স্থানে চলে যায়।
আমার কাছে ইসলামের শিক্ষা ভিন্ন।
আমার প্রথম দায়িত্ব আমার নিজের মানুষের প্রতি। কারণ আমি তাদেরই একজন। তাদের দুঃখ আমাকে বেশি নাড়া দেবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই নৈকট্য কখনোই অন্য মানুষের প্রতি অবিচার করার অনুমতি নয়। বরং নৈকট্য দায়িত্ব বাড়ায়, নৈতিক ব্যতিক্রম তৈরি করে না।
এই কারণেই আমি বলি, আমি এই অঞ্চলের মাটি ও মানুষকে ভালোবাসি। আমি তাদের উন্নতি চাই। তাদের নিরাপত্তা চাই। তাদের মর্যাদা চাই।
কিন্তু আমি এমন কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করি না, যা আমাকে শেখায় যে এই ভালোবাসার জন্য অন্য নিরপরাধ মানুষের রক্তকে কম মূল্যবান ভাবতে হবে।
আমার কাছে ন্যায় জাতির চেয়ে বড়।
আর এই কারণেই, আমি আমার মাটি ও মানুষকে ভালোবাসলেও, জাতীয়তাবাদী নই।







Comments