কীভাবে আলেমরা সমাজে তাদের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করবেন

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত গণমাধ্যমে প্রকাশ্যে দ্বীনের ওপর আক্রমণ চলছে, অথচ কোনো শক্তিশালী প্রতিরোধ দাঁড়াচ্ছে না। মুহাম্মাদ ইলহামী দেখাচ্ছেন, এর মূলে রয়েছে আলেমদের ঐতিহাসিক স্বাধীনতার কাঠামো ভেঙে পড়া—এবং তা পুনর্নির্মাণেই রয়েছে মুক্তির পথ।
كيف يستعيد العلماء مكانتهم في الحياة
মুহাম্মাদ ইলহামী · অনুবাদ: সাদিক শাহরিয়ার
গত কয়েক সপ্তাহে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং অর্থায়নে পরিচালিত বৃহত্তর গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে কয়েকজন আরব ব্যক্তিত্ব প্রকাশ্যে দীনের ওপর আক্রমণ চালিয়েছেন এবং নির্লজ্জভাবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করার দুঃসাহস দেখিয়েছেন। এ মুহূর্তে তাদের বক্তব্য খণ্ডন করা, এমনকি সেগুলোর বিস্তারিত পর্যালোচনা করাও আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি কেবল এগুলোর উল্লেখ করছি—আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং আমরা অধঃপতনের কত গভীরে নেমে গেছি, তা স্পষ্ট করে দেখানোর জন্য।
ইউসুফ যায়দান দাবি করেছেন, আসহাবে ফীলের ঘটনা কখনো ঘটেনি; বরং তা লোকমুখে প্রচলিত কল্পকাহিনি, যার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। তিনি আরও দাবি করেছেন, বায়তুল মুকাদ্দাসের পবিত্রতার ধারণা উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিকের তৈরি একটি মনগড়া গল্প ছাড়া আর কিছুই নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নবুওয়তের যুগে তো নয়ই, এমনকি উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর যুগেও এই নগরী ‘আল-কুদস’ নামে পরিচিত ছিল না। তখন উপস্থাপককে এমন উচ্ছ্বসিত ও পুলকিত মনে হচ্ছিল, যেন এই নতুন উপলব্ধিই উম্মাহকে বিশাল বিশাল সব সংকটগুলো থেকে মুক্তি দেবে!
ফাওযী আল-বাদাওয়ী দাবি করেছেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাকি গির্জারই একটি বিচ্ছিন্ন শাখার অনুসারী ছিলেন; আর ইসলাম হচ্ছে ইহুদি ও খ্রিষ্টধর্ম থেকে বেরিয়ে আসা একটি উপদল। তিনি আরও একবার আম্বিয়ায়ে কেরাম; ইবরাহীম এবং ইসমাঈল আলাইহিমাস সালামের ঐতিহাসিক অস্তিত্ব সম্পর্কে ত্বহা হুসাইনের উত্থাপিত সংশয়গুলোকেই পুনর্জীবিত করেছেন। এ বিষয়ে তার অবস্থান সিরীয় লেখক ফিরাস সাওয়াহের বক্তব্যের সাথেও মিলে যায়। যারা বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কে আগ্রহী, তারা এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষকের লেখা জবাবগুলো পড়ে দেখতে পারেন। আমার জানা মতে, এসব উদ্ভট প্রলাপের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছেন ডক্টর সামী আমেরী। তিনি তার সুবিস্তৃত গ্রন্থসমূহে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার লেখালেখির মাধ্যমে এসবের বিস্তারিত খণ্ডন করেছেন।
কিন্তু এখানে আমার মূল উদ্দেশ্য হলো— আমরা একসাথে বুঝতে চাই, আমরা কীভাবে এই অবস্থায় এসে পৌঁছালাম? কেন আজ আমাদের দেশেই মুসলমানদের অর্থে পরিচালিত এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে প্রকাশ্যে সুস্পষ্ট কুফরি কথা উচ্চারিত হচ্ছে? কেন আমরা আর সেই জনরোষ দেখতে পাই না, যা একসময় ডেনমার্ক, ফ্রান্স, এমনকি ভারতেও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবমাননার ঘটনায় কখনো কখনো দেখা যেত? আর সবশেষে, কেন আলেমদের পক্ষ থেকেও অন্তত একটি শক্তিশালী অবস্থান সামনে এলো না—যখন তারাই নবুয়তের উত্তরাধিকারী এবং এমন পরিস্থিতিতে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সর্বাধিক হকদার? এখানে আমাদের এই বেদনাবিধুর কাহিনির একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরতে হবে, যাতে আমরা বুঝতে পারি—কীভাবে আলেমদের ভূমিকা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
যে দ্বীন নিজেই রাষ্ট্র গড়েছিল
অন্যান্য ধর্ম ও সভ্যতার তুলনায় ইসলামের অন্যতম স্বাতন্ত্র্য হলো, এটি এমন একটি দ্বীন, যা নিজেই একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। এরপর সেই রাষ্ট্র বিস্তৃত হয়ে এক মহান জাতি এবং এক বিশাল সভ্যতায় পরিণত হয়। অন্যদিকে, অধিকাংশ রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যের ইতিহাসে আমরা দেখি—প্রথমে রাজনৈতিক সংঘাত ও ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে একটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়; তারপর সেই রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্য কোনো একটি ধর্ম গ্রহণ করে, আর সেই ধর্মই পরিণত হয় রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্যের সরকারি ধর্মে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যগুলোর একটি হলো, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করা, দ্বীনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং দ্বীনকে পাহারা দেওয়ার উদ্দেশ্যে। পক্ষান্তরে, অন্যান্য সভ্যতার অভিজ্ঞতায় ধর্ম ছিল রাজনীতির একটি হাতিয়ার এবং সাম্রাজ্যিক প্রয়োজন পূরণের একটি মাধ্যম।
ইসলামে রাষ্ট্র ছিল দ্বীনের সেবক; আর অন্যান্য ব্যবস্থায় দ্বীনই ছিল রাষ্ট্রের সেবক। মোটাদাগে এটাই ইতিহাসের প্রধান চিত্র।
এ কারণেই আপনি যখন ইসলামী রাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত গ্রন্থে খলিফার দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা পড়বেন, তখন দেখবেন সেগুলো মূলত দুটি বিষয়েই সীমাবদ্ধ—দ্বীনের সংরক্ষণ এবং দ্বীনের মাধ্যমে দুনিয়ার পরিচালনা। অর্থাৎ, খিলাফতের দায়িত্ব মূলত একটি দ্বীনি দায়িত্ব। আবার খলিফার যোগ্যতার শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা পড়লে দেখবেন, তার অন্যতম শর্ত হলো ইজতিহাদ। অর্থাৎ, তিনি এমন একজন আলেম হবেন, যিনি ফিকহে ইজতিহাদের স্তরে উপনীত হয়েছেন। যাতে তিনি উদ্ভূত নতুন নতুন ঘটনা এবং তার সামনে উপস্থিত রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর যথাযথ সমাধান দিতে পারেন। কারণ, এসব বিষয় স্বভাবগতভাবেই অত্যন্ত জটিল; আর এগুলো মোকাবেলার জন্য এমন শক্তিশালী ইজতিহাদি যোগ্যতা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে কল্যাণ (মাসলাহাহ) ও অকল্যাণ (মাফসাদাহ)-এর মাঝে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব।
কেননা ইসলাম একটি বাস্তবমুখী ও কর্মমুখী দ্বীন, নিছক কোনো তাত্ত্বিক দর্শন নয়; আর যেহেতু এটি জীবনের বাস্তব পরিসরে একটি কার্যকর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে, কাগজে আঁকা কোনো কল্পলোকের আদর্শ নগরীর ধারণা হয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তাই খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগ থেকেই মুসলমানরা এমন নানা ঘটনা ও নতুন নতুন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন, যেগুলোর সমষ্টি তাদের সিয়াসী ফিকহ তথা রাজনৈতিক ফিকহ গড়ে তুলেছে।
খিলাফাতে রাশেদার অবসানের পর তারা উপলব্ধি করেছিলেন যে, বিদ্যমান সভ্যতার মডেলটি কাঙ্ক্ষিত ও আদর্শ অবস্থান থেকে এক বা একাধিক ধাপ নিচে নেমে এসেছে। তাই তাদের সিয়াসী ফিকহে সর্বদা আদর্শ অবস্থা এবং তার প্রকৃতি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এরপর যখন সেই আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি, তখন তার উপযোগী সমাধান বের করার জন্য ইজতিহাদ করা হয়েছে। বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী শাসকদের যুগ এবং বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের পুরো সময়জুড়েই সিয়াসী ফিকহ এ কথা স্পষ্টভাবে বলে এসেছে যে, এই ব্যবস্থা আদর্শের খেলাফ। একে গ্রহণ করা হয়েছে কেবল অনিবার্যতার কারণে; আর সেটিও বৃহত্তর অনিষ্টতা প্রতিরোধে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রতর অনিষ্টতাকে মেনে নেওয়ার নীতির ভিত্তিতে। এ বিষয়ে তাদের আলোচনা দীর্ঘ, বিস্তৃত এবং সমৃদ্ধ।
সুতরাং, যখন রাষ্ট্র ছিল দ্বীনের সেবায় নিয়োজিত, রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল মূলত একটি দ্বীনি দায়িত্ব, আর তার শাসক হতেন একজন মুজতাহিদ ফকীহ; তখন সেই রাষ্ট্র ও সেই সভ্যতায় আলেমদের অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদা ছিল। কারণ, তারাই নবীদের উত্তরাধিকারী, তারাই রব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে বক্তব্য পৌঁছে দেন এবং তারাই দ্বীনের সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করেন।
এই মর্যাদার কারণেই শাসকের মোকাবেলায় তাদের একটি স্বতন্ত্র কর্তৃত্ব ছিল; বরং শাসকের ওপরও তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিল। শাসকের জবাবদিহি নিশ্চিত করার অধিকারও তাদের ছিল। কুরআনের আয়াতও নির্দেশ করে যে, উম্মাহ ও শাসকদের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে চূড়ান্ত মীমাংসার ভিত্তি হবে তারাই। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ ফরমান,
یَـٰۤأَیُّهَا ٱلَّذِینَ ءَامَنُوۤا۟ أَطِیعُوا۟ ٱللَّهَ وَأَطِیعُوا۟ ٱلرَّسُولَ وَأُو۟لِی ٱلۡأَمۡرِ مِنكُمۡۖ فَإِن تَنَـٰزَعۡتُمۡ فِی شَیۡءࣲ فَرُدُّوهُ إِلَى ٱللَّهِ وَٱلرَّسُولِ
হে মুমিনগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, তাঁর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা এখতিয়ারধারী তাদেরও। অতঃপর তোমাদের মধ্যে যদি কোনও বিষয়ে বিরোধ দেখা দেয়, তবে তোমরা আল্লাহ ও পরকালে সত্যিকারের বিশ্বাসী হয়ে থাকলে সে বিষয়কে আল্লাহ ও রাসূলের উপর ন্যস্ত কর। (সূরা নিসা, আয়াত: ৫৯)
এই আয়াতের তাৎপর্য হলো, ওহীর ধারা সমাপ্তি এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর মতবিরোধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ রেফারেন্স হবেন আলেমগণ। কারণ, তারাই আল্লাহর পক্ষ থেকে হুকুম-আহকাম ব্যাখ্যা করেন এবং তারাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তরাধিকারী।
চারটি স্তম্ভ, যা আলেমকে স্বাধীন রাখত
এক: সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান
ইসলাম এমন এক সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, যার ফলে আলেমগণ সমাজে উচ্চ মর্যাদা ও ব্যাপক প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী হতেন। যাতে তারা পথভ্রষ্ট শাসকের মোকাবেলা করার সক্ষমতা অর্জন করেন। প্রথমে তাকে উপদেশ ও সংশোধনের মাধ্যমে, আর সর্বশেষ পর্যায়ে প্রয়োজনে তার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের মাধ্যমে। এই ব্যবস্থাপনার প্রথম ধাপ ছিলো, আলেমদের মানসিক ও আদর্শিকভাবে এমনভাবে প্রস্তুত করা যে, তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে বিধান ব্যাখ্যাকারী, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তরাধিকারী, দ্বীনের প্রহরী এবং তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া ও সমাজে প্রতিষ্ঠা করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত।
অতঃপর, মুসলিমদের জীবনযাত্রার প্রতিটি স্তরে দ্বীনের গভীর প্রভাব তাদেরকে সর্বদা আলেমদের মুখাপেক্ষী করে রেখেছিলো। সালাত, যাকাত, সাওম, হজ, বিবাহ, তালাক, ক্রয়-বিক্রয়, উত্তরাধিকার—এমনকি সন্তান প্রতিপালন, পারস্পরিক বিরোধ নিষ্পত্তি এবং দরিদ্র-অসহায়দের ব্যয়ভার বহনের মতো বিষয়েও তারা আলেমদের দিকনির্দেশনার প্রয়োজন অনুভব করতো। এসব কিছুর ফলে একজন আলেম তার সমাজে ছিলেন সম্মানিত, প্রভাবশালী ও মর্যাদাবান। আর যখন এই সামাজিক প্রভাব ও মর্যাদা তার নিজের অন্তরে জাগ্রত দায়িত্ববোধের সঙ্গে মিলিত হতো, তখন অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হতেন। যদি একক নেতৃত্ব তার হাতে না-ও থাকত, তবুও তিনি অন্তত নেতৃত্বের একজন অংশীদার হয়ে উঠতেন। ফলে কখনোই তাকে উপেক্ষা করার সুযোগ থাকত না।
দুই: স্বাধীন অর্থনৈতিক ভিত্তি
আর ইসলাম এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, যার ফলে আলেমগণ শাসকগোষ্ঠীর বেতন-ভাতার মুখাপেক্ষী হয়ে পড়তেন না। এই ব্যবস্থার প্রথম ভিত্তি হলো, আলেমদেরকে এমনভাবে মানসিক ও আত্মিকভাবে গড়ে তোলা, যাতে তারা যুহদ, ইবাদত, ইখলাস, দুনিয়াবিমুখতা এবং আখিরাতমুখী জীবনধারার অধিকারী হন। দ্বিতীয়ত, যাকাতের নির্ধারিত খাতসমূহের মধ্যে আলেমদের জন্যও একটি অংশ নির্ধারিত হয়েছে, যা আল্লাহ তায়ালার বাণী وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ তথা আল্লাহর পথের অন্তর্ভুক্ত।
তৃতীয়ত, মুসলিম সমাজের সামাজিক কাঠামো এমনভাবে বিন্যস্ত ছিল যে, কোনো সম্পদশালী ব্যক্তি যদি আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে চাইতেন অথবা সমাজে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করতে চাইতেন, তবে তিনি নিজের সম্পদ থেকে মক্তব, মাদরাসা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা এবং আলেমদের সম্মান ও ভরণপোষণের জন্য ব্যয় করতেন। এর পাশাপাশি ছিল ওয়াকফ-ব্যবস্থা; যা রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি স্থায়ী অর্থনৈতিক উৎস ছিল। আলেমগণ ইলমচর্চা, পাঠদান, খুতবা প্রদান এবং দ্বীনের বিভিন্ন নিদর্শন ও ইবাদত প্রতিষ্ঠার জন্য আত্মনিয়োগের বিনিময়ে সেখান থেকে আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করতেন। ফলে আলেমদের জীবিকা নির্বাহের জন্য শাসকদের দরবারে হাত পাততে হতো না, আর তাদের জীবনও রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। অর্থাৎ, তারা এমন কোনো সরকারি কর্মচারী ছিলেন না, যাদের জীবিকা ক্ষমতাসীন শাসকের বেতনের ওপর নির্ভরশীল।
তিন: শরীয়তনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা
আবার ইসলাম এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল—এভাবে বললেও অত্যুক্তি হবে না—যার মাধ্যমে আলেমদের ইলমচর্চা সরাসরি কুরআন-সুন্নাহর মূল উৎসের সাথে সংযুক্ত থাকত। একজন আলেম যখন শৈশবে মক্তবে প্রবেশ করতেন, তখন থেকেই তিনি কুরআন, সুন্নাহ এবং স্বীকৃত ফিকহি মাযহাবের শিক্ষা গ্রহণ করতে থাকেন। এই ইলমীধারা তার শায়খের মাধ্যমে শায়খের শায়খ হয়ে ধারাবাহিক সূত্রে মাযহাবের ইমাম পর্যন্ত পৌঁছে যেত, যিনি তাবেয়ীদের নিকট থেকে, তাবেয়ীগণ সাহাবায়ে কেরামের নিকট থেকে, আর সাহাবায়ে কেরাম সরাসরি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে তা গ্রহণ করেছেন। আর এই ধারাবাহিকতাই ছিল সেই সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব, যার সাথে সম্পৃক্ত হওয়া হতো, যেখান থেকে ইলম আহরণ করা হতো, যার ভিত্তিতে ফতোয়া দেওয়া হতো এবং যার বিধান অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালিত হতো।
সুতরাং, একজন আলেমের মূল রেফারেন্স বা কর্তৃত্বের উৎস হলো শরীয়ত, রাষ্ট্র নয়। তার জ্ঞানচর্চার পদ্ধতি এমন এক স্বাধীন ইলমী সিলসিলার সাথে যুক্ত; যা কোনো শাসকগোষ্ঠী নির্মাণ করেনি। তিনি এমন মক্তব ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষালাভ করেন, যেগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শরীয়তের সংরক্ষণ ও ধারাবাহিকতা রক্ষার উদ্দেশ্যে; এমন পাঠ্যক্রমে গড়ে তোলার জন্য নয়, যা রাষ্ট্র নিজস্ব প্রয়োজনে তৈরি করে শিক্ষার্থীদের সরকারি কর্মচারীতে পরিণত করবে এবং রাষ্ট্রকেই সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত করবে।
চার: কেন্দ্রহীন, বিস্তৃত নেটওয়ার্ক
ইসলামী সমাজব্যবস্থার আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, আলেমসমাজ কখনো কোনো পিরামিড-আকৃতির শ্রেণিবিন্যাস, কেন্দ্রীভূত সাংগঠনিক কাঠামো বা এমন কোনো প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়নি, যার কোনো এক নির্দিষ্ট প্রধানকে নিয়ন্ত্রণ করলেই পুরো আলেমসমাজকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো; বরং তারা ছিলেন সমাজজুড়ে বিস্তৃত, পারস্পরিকভাবে সংযুক্ত এবং গভীরভাবে প্রোথিত একটি জ্ঞানভিত্তিক নেটওয়ার্ক। এই ধারা আলেমদের নিজস্ব ইলমী শক্তি ও স্বয়ংক্রিয় বিকাশের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। আলেমগণ নিজেরা নিজেদেরকে চিনতেন, নিজেদের অঙ্গনকে অপাত্র ও অনুপ্রবেশকারীদের থেকে পরিশুদ্ধ রাখতেন এবং মিথ্যাভাবে তাদের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া দাবিদারদের পৃথক করে দিতেন।
শাসকগোষ্ঠী যদি তাদের মধ্য থেকে কাউকে বিচারক, মুফতি বা অন্য কোনো পদে নিয়োগও করত, তবুও তারা সংখ্যায় অল্পই থাকতেন। উপরন্তু, এসব বিচারক ও মুফতীর ইলমী গঠন রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন পরিবেশে সম্পন্ন হতো। সমাজে তাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হতো ইলমী অঙ্গন ও জনসমাজের স্বীকৃতির মাধ্যমে; রাষ্ট্রপ্রদত্ত কোনো সনদের মাধ্যমে নয়। তারা যখন ফতোয়া দিতেন বা বিচার করতেন, তখন তা করতেন কুরআন, সুন্নাহ এবং সেই ফিকহী মাযহাবের আলোকে, যা রাষ্ট্র প্রণয়ন করেনি।
| বিবেচ্য দিক | ঐতিহ্যবাহী আলেম | আধুনিক আইনজ্ঞ |
|---|---|---|
| কর্তৃত্বের উৎস | শরীয়ত ও ধারাবাহিক ইলমী সিলসিলা | রাষ্ট্রপ্রণীত আইন ও সংবিধান |
| শিক্ষার কাঠামো | মক্তব, মাদরাসা ও ওয়াকফভিত্তিক প্রতিষ্ঠান | রাষ্ট্র-নির্ধারিত পাঠ্যক্রম ও বিশ্ববিদ্যালয় |
| জীবিকা | ওয়াকফ, যাকাত ও সমাজের পৃষ্ঠপোষকতা | রাষ্ট্রীয় বেতন ও অবসরভাতা |
| মর্যাদার স্বীকৃতি | ইলমী অঙ্গন ও জনসমাজের স্বতঃস্ফূর্ত স্বীকৃতি | রাষ্ট্রপ্রদত্ত সনদ ও পদোন্নতি |
| সাংগঠনিক রূপ | কেন্দ্রহীন, বিস্তৃত নেটওয়ার্ক | পিরামিড-আকৃতির প্রশাসনিক কাঠামো |
এটি আধুনিক আইনজ্ঞের অবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত; তাকে শৈশব থেকেই রাষ্ট্র নিজের শিক্ষাব্যবস্থায় নিয়ে আসে, রাষ্ট্র-নির্ধারিত পাঠ্যক্রমে শিক্ষিত করে, নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়, নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেয় এবং বেতনের মাধ্যমে তার জীবনকে রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে। তার সমগ্র শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনে সে জানে, তার প্রতিটি সাফল্য, প্রতিটি পদোন্নতি এবং প্রতিটি মর্যাদা রাষ্ট্রপ্রদত্ত সনদ ও অনুমোদনের ফল; সমাজের স্বতঃস্ফূর্ত স্বীকৃতির ফল নয়। অবশেষে, সে এমন একটি সরকারি প্রশাসনিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয়, যার শীর্ষে থাকে রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতিনিধি। ফলে রাষ্ট্র থেকে স্বাধীন থাকার অর্থই তার কাছে অচেনা থেকে যায়—মানসিকভাবে, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে এবং সাংগঠনিকভাবেও।
আধুনিক রাষ্ট্র: নতুন উপাস্য
এ বিষয়ে আরও অনেক কথা বলা যেতে পারে। তবে আমাদের বর্তমান আলোচনার জন্য পূর্বে যা উল্লেখ করা হয়েছে, তাই যথেষ্ট। কারণ, তা থেকেই বোঝা যায় কীভাবে পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে এবং অবস্থা অধঃপতিত হয়েছে। ইতিহাসের গভীর বিশ্লেষণে না গিয়ে সংক্ষেপে বললে, উপনিবেশের আগে, উপনিবেশ চলাকালে এবং উপনিবেশ-পরবর্তী সময়ে আমাদের দেশে যে পাশ্চাত্য ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ও প্রভাবশালী হয়েছে, এবং যা আজও বিশ্বের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে আছে—সেই ব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে, রাষ্ট্রক্ষমতা সব ধরনের শক্তি নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করে নেয় এবং সেগুলো সমাজের কাছ থেকে কেড়ে নেয়। ফলে মানুষের বাস্তব জীবনে রাষ্ট্রই এক প্রকৃত উপাস্যে পরিণত হয়; মানুষকে সে কেবল তাই-ই দেখতে দেয়, যা সে নিজে দেখতে চায়; রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে মানুষের আর কোনো কর্তৃত্বের উৎস থাকে না, এবং রাষ্ট্রকে ছাড়া তাদের কোনো হায়াতও থাকে না।
এটি এমন এক রাষ্ট্রক্ষমতা, ইসলামী ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের যে নির্ধারিত দায়িত্ব ছিল—অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি—শুধু তাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সবকিছুর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। মানুষের চরিত্র ও মানসিকতাকে নিজের ইচ্ছামতো গড়ে তোলে; তাদের সম্পদ ও অস্ত্র কেড়ে নেয়; তারপর তাদের নিজেদের অর্থে নির্মিত বিদ্যালয়ে পড়তে বাধ্য করে এবং নিজস্ব রচিত পাঠ্যক্রম তাদেরকে আত্মস্থ করায়। তাদের জন্য ক্রয়-বিক্রয়, লেনদেন, বিবাহ, তালাক, ভ্রমণ, এমনকি জন্ম, মৃত্যু ও উত্তরাধিকার পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ে আইন প্রণয়ন করে। তাদের শিক্ষা, পদোন্নতি, চাকরি, বেতন ও অবসরভাতাও নিয়ন্ত্রণ করে। আর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের চিন্তা-চেতনাও নিয়ন্ত্রণ করে; এগুলোর সবই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন।
মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সূক্ষ্মতম বিষয়েও তারা এমন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, যা ফিরআউন, কিসরা কিংবা কায়সারেরও ছিল না।
রাষ্ট্রই হলো ক্ষমতা, আর ক্ষমতা হলো যারা শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত, সেই ব্যক্তিরা। ফলে তারাই যেন দেশ হয়ে দাঁড়ায়, তাদের ইচ্ছাই আইন ও সংবিধানে রূপ নেয়। যদিও বিশেষ কিছু ঐতিহাসিক কারণে পাশ্চাত্যে এমন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, যেখানে কোনো না কোনো মাত্রায় ক্ষমতার ভারসাম্য ছিল—তা ভ্রান্ত হোক বা দুর্বল, এ নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে; কিন্তু আমাদের দেশে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে বিদেশি শক্তি ও তাদের প্রতিনিধিদের হাতে। ফলে রাষ্ট্র কার্যত একটি সংগঠিত সশস্ত্র গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। এই গোষ্ঠী সমাজের সকল শক্তি কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রের নামে নিজের হাতে সকল শক্তিগুলোকে কেন্দ্রীভূত করেছে। তারপর রাষ্ট্রের নামেই মানুষকে এমন দাসে পরিণত করেছে, যারা তাদের জন্য উপাসনালয়, ভাস্কর্য, প্রাসাদ, নতুন রাজধানী এবং তারা যা ইচ্ছা তাই নির্মাণ করে।
প্রকাশ্য কুফর ও অক্ষমতার সংকট
আপনি যদি সত্য ও বাস্তবতা জানতে চান, তবে এখন আর এটি বিতর্কের বিষয় নয় যে, এসব শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা উচিত হবে নাকি হবে না? আল্লাহর শপথ! ইনসাফপূর্ণ স্বাধীন দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি সামান্য চিন্তা করলেই বুঝতে পারবে যে, শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে আবশ্যককারী প্রকাশ্য কুফর এসব রাষ্ট্রে প্রকাশ পেয়েছে। আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে টেলিভিশন অনুষ্ঠান, নাটক ও গান-বাজনায় অবমাননা করার চেয়ে বড় (কুফর) আর কী হতে পারে? তার শরীয়তকে অচল করে দিয়ে তার স্থলে অন্য কিছু প্রতিস্থাপন করার চেয়ে বড় (কুফর) আর কী হতে পারে? মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে জায়োনিস্টদের সাথে এবং ক্রুসেডারদের সাথে হাত মেলানোর চেয়ে স্পষ্ট (কুফর) আর কী হতে পারে? একটি নতুন দীনের প্রণয়ন করা, ইহুদি রাষ্ট্রের বৈধতা দেওয়া এবং সংস্কারকদের কোণঠাসা করা ও দাঈ ও মুজাহিদদের কারারুদ্ধ করার চেয়ে বড় অপরাধ আর কী হতে পারে?
আর প্রকাশ্য কুফরের অস্তিত্ব তো ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান হয়েছে; এ বিষয়ে কোনো বিবেকবান ব্যক্তি বিতর্ক করবে না। তবে প্রকৃত সংকট হলো ‘অক্ষমতা ও অপারগতার সংকট’। আর এই অক্ষমতার সংকটই কিছু মানুষকে প্রকাশ্য কুফরের প্রকাশ ঘটেছে—এ কথা স্বীকার করতে বাধা দেয় এবং তা নিয়ে বিতর্ক করতে বাধ্য করে। কারণ, তারা যদি প্রকাশ্য কুফরের প্রকাশ ঘটেছে বলে স্বীকার করে নেয়, তখন তাদের সামনে করণীয় সম্পর্কে প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। আর একজন অক্ষম মানুষের কাছে সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো—করণীয়ের প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া। আর তখনই বা কেমন হবে— যদি সেই করণীয়ের মূল্য ও ত্যাগ হয় অত্যন্ত বড় ও কঠিন!
মুক্তির পথ: সম্পদ, গণমাধ্যম ও অস্ত্র
তাই আসল প্রশ্নটি হলো, উম্মাহ এবং তাদের অগ্রভাগে থাকা উলামায়ে কেরাম কীভাবে এই অক্ষমতা ও অপারগতা থেকে মুক্তি পাবে? এর জন্য এমন এক ব্যতিক্রমধর্মী শ্রেণির আলেম প্রয়োজন, যারা একই সাথে ফিকহী ইজতিহাদের প্রখরতা এবং মনের দৃঢ়তা ও সাহসিকতার এক অনন্য সমন্বয় ঘটাবেন। পাশাপাশি তাদের থাকবে এমন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, যা সুযোগের সঠিক ব্যবহার করতে এবং যুগান্তকারী মুহূর্তগুলোকে চিনে নিতে সক্ষম হবে; এবং তারা সমাজের সব ধরনের শক্তি ও সামর্থ্যকে কেড়ে নেওয়া সেই আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্র (মডার্ন স্টেট মেশিনারি)-কে অচল করে দেওয়ার জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাবেন।
তিনটি বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা আবশ্যক— সম্পদ, গণমাধ্যম ও অস্ত্র। কীভাবে এই তিনটি বিষয়ে রাষ্ট্রের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভাঙা যায়? আর কীভাবে এই একই তিনটি বিষয়ে আলেমসমাজকে শক্তিশালী করা যায়? উম্মাহর বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ, হিম্মতওয়ালা ব্যক্তিবর্গ এবং উম্মাহর অগ্রদূত আলেমদের উপর আবশ্যক হচ্ছে, গুরুত্বসহকারে, নিরবচ্ছিন্নভাবে দীর্ঘমেয়াদি সবরের সহিত কাজ করা, যাতে আলেমদের জন্য স্বাধীন আর্থিক উৎস গড়ে তোলা যায়।
যতবারই আমরা কোনো আলেমকে অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত করতে পারব, ততবারই আমরা আরও শক্তিশালী, সাহসী ও বিপ্লবী একজন আলেমকে পাব।
কারণ, সেই আলেমই স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে সক্ষম হবেন, আর সেই স্বাধীন চিন্তাই তাকে সঠিক পথের দিশা দেবে এবং যথাসময়ে সঠিক ফতোয়ায় উপনীত করবে। আর উলামা সমাজ যখনই অর্থায়নের দিক থেকে স্বাবলম্বী এবং স্বাধীন শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরির মাধ্যমে নিজেদের একটি জোরালো কণ্ঠস্বর গড়ে তুলতে সক্ষম হবে, তখনই তারা বাতিল ও ফাসাদের মোকাবেলা করতে আরও বেশি সমর্থ হবে। তেমনি তারা প্রকাশ্যে আল্লাহ ও তার রাসূলকে মিথ্যারোপকারী জিন্দীক ও মুরতাদদের যথাযথভাবে চিহ্নিত করতেও অধিক সক্ষম হবে। আর এর অনিবার্য ফল হবে— হকের শক্তি বৃদ্ধি পাওয়া এবং বাতিলের শক্তি দুর্বল হয়ে পড়া।
আর যখন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হবে— অর্থাৎ উলামা সমাজ একটি সশস্ত্র সুরক্ষার ছত্রছায়ায় থাকবে, যার সর্বোত্তম রূপ হলো, এই সুরক্ষা কোনো শক্তিশালী ও স্বাধীন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হওয়া, তখন তারা এমন এক নিরাপত্তা লাভ করবেন যা তাদেরকে হকের বাণী উচ্চারণে সক্ষম করে তুলবে। তখন তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে কোনো নিন্দুকের নিন্দাকে পরোয়া করবেন না এবং নিজেদের ব্যাপারে কারাবাস, লাঞ্ছনা কিংবা নির্যাতনের ভয় পাবেন না। অথচ কত শত সালেহীন-মুসলেহীনদের জবানকে কেবল (সুরক্ষার অভাবের) এই ভয়ই স্তব্ধ করে দিয়েছে! যদি এখনই এসব বিষয়ের সবকিছু সম্ভব না-ও হয়, তবুও অন্তত সে লক্ষ্যে পৌঁছার পথ নিয়ে চিন্তা করা সম্ভব। চিন্তা করা সহজ, কিন্তু কাজ করা সহজ নয়। আমরা কি একটু আগেই বলিনি যে, আমাদের এই বর্তমান যুগের এমন এক ব্যতিক্রমী শ্রেণির আলেমের প্রয়োজন, যাদের মাঝে ইলমি গভীরতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং কর্মশক্তি— সবকিছুরই এক অনন্য সমন্বয় থাকবে?
আর যতদিন পর্যন্ত তা সম্ভব না হয়, ততদিন বর্তমান রাষ্ট্রগুলোর শক্তির উপকরণগুলোর ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভাঙার জন্যও নিরলস ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। রাষ্ট্র কতৃক মানুষকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা যতটুকু সীমিত করা যাবে, ততই তা মানুষের জন্য কল্যাণকর হবে। আর ততই তা হবে সেই সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রশক্তির ক্ষমতা হ্রাস করার একটি উপায়, যে রাষ্ট্র তার সব শক্তি প্রকাশ্য কুফরের প্রচার ও তার সুরক্ষায়, এবং এর মোকাবেলাকারীদের দমন করার কাজে ব্যবহার করে।
প্রথম পদক্ষেপ
আমি একটি মাত্র অনুকরণীয় বিষয় পেশ করব; যা পেছনের বাস্তবতাগুলোর অকাট্য প্রমাণ বহন করে।
উম্মাহর আজ এমন আলেমদের বড্ড প্রয়োজন, যারা মানুষের পারস্পরিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য শরীয়াহ আদালত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবেন এবং সেগুলো বিস্তৃত করবেন। একইসাথে এমন ফতোয়াও প্রচার করবেন, যাতে মুসলিমের জন্য শরীয়াহ আদালতের শরণাপন্ন হওয়া সম্ভব থাকলে রাষ্ট্রের আদালতে যাওয়া হারাম বলে ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করবেন, যা শরীয়াহর বিচারক তৈরি করবে। এটাই হবে সমাজের স্বাধীনতার পথে এবং আলেমদের মর্যাদা-প্রভাব পুনরুদ্ধারের প্রথম পদক্ষেপ। আমি জানি, অধিকাংশ দেশে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। কিন্তু এ নিয়ে চিন্তা করা, গুরুত্ব দেওয়া এবং গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে থাকলে, প্রত্যেক স্থানের বাস্তবতা অনুযায়ী সম্ভাব্য সমাধানগুলো বের হয়ে আসবে। এরপর যখন কোথাও কোনো পরিবর্তনের মুহূর্ত আসবে, তখন উপযুক্ত সময়ে সেই সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য মানসিক প্রস্তুতিও তৈরি হবে।
একই কথা বলা যায় শরিয়াহভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনগণের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠান (যা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে), জনগণের মালিকানাধীন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান (যেগুলোও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণমুক্ত), গণমাধ্যম, আইনগত কাঠামো, সমাজের প্রভাবশালী ও সম্মানিত ব্যক্তিদের সমর্থন অর্জন, এমনকি শাসকশ্রেণি ও ক্ষমতাসীনদের মধ্য থেকেও যাদের সম্ভব তাদের অনুকূলে আনার প্রচেষ্টার ক্ষেত্রেও—ইত্যাদি।
এটি সমগ্র উম্মাহর বিষয়
বর্তমানে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো অক্ষমতার অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা। আমার মনে হয় না, এমন কোনো যুগ অতিবাহিত হয়েছে যেখানে সত্যগুলো এ যুগের মতো এত স্পষ্টভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এ পথের মূল্য সহজ হবে না। আর এটিও সন্দেহাতীত যে, এই ব্যতিক্রমধর্মী আলেমদের মধ্যে যারা এ যাত্রার সূচনা করবেন, তাদের কেউ কেউ এ পথেই শহীদ হবেন। কিন্তু তাদের এই শাহাদাতই পরবর্তী অগ্রযাত্রার পথ সুগম করবে।
আলেমগণ উম্মাহর অগ্রসারী, উম্মাহর বিকল্প নন।
এরপর প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য হলো এই পথকে সমর্থন করা। কারণ এটি পুরো উম্মাহর বিষয়। এমন নয় যে, কেবল তারাই কাজ করবেন আর উম্মাহর বাকি মানুষ দর্শকসারিতে বসে শুধু উৎসাহ দেবে। তারপর একে একে কোনো আলেমকে ফাঁসিতে ঝুলতে, নিহত হতে বা কারাগারে বন্দি হতে দেখে কেবল তা পর্যবেক্ষণ করবে। এটি সমগ্র উম্মাহর বিষয়। তাই প্রত্যেক মুসলিমের এতে একটি ভূমিকা রয়েছে— হকপন্থী আলেমদের সমর্থন করা, নিজের সাধ্য অনুযায়ী তাদের সাহায্য করা, সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের থেকে অনিষ্ট প্রতিহত করা এবং নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী তাদের জন্য পথ সুগম করার চেষ্টা করা। জনৈক প্রবক্তা সত্যিই বলেছেন—
من صح منه العزم أرشد للحيل
‘যার সংকল্প খাঁটি হয়, সে (লক্ষ্যে পৌঁছানোর) কৌশল-উপায়ও ঠিকই খুঁজে পায়!’
আর আমাদের মহান রব তো বলেই দিয়েছেন,
وَٱلَّذِینَ جَـٰهَدُوا۟ فِینَا لَنَهۡدِیَنَّهُمۡ سُبُلَنَاۚ وَإِنَّ ٱللَّهَ لَمَعَ ٱلۡمُحۡسِنِینَ
যারা আমার উদ্দেশ্যে প্রচেষ্টা চালায়, আমি তাদেরকে অবশ্যই আমার পথে উপনীত করব। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সঙ্গে আছেন। (সূরা আনকাবূত, আয়াত: ৬৯)
মুহাম্মদ ইলহামী (জন্ম: ১৯৮৩) একজন প্রখ্যাত মিশরীয় ইতিহাসবিদ, গবেষক ও চিন্তাবিদ। তিনি মূলত ইসলামী ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সমসাময়িক ভূ-রাজনীতি নিয়ে কাজ করেন। মুসলিম উম্মাহর সংকট, আধুনিক ইতিহাসের রূপান্তর এবং সমকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে তার গভীর ও বিস্তৃত গবেষণা রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের পাশাপাশি তিনি ডিজিটাল মিডিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় কণ্ঠস্বর; বিশেষ করে তাঁর ঐতিহাসিক আলোচনা সিরিজ ‘১০০ কোয়েশ্চেনস ইন হিস্ট্রি’ (مائة سؤال في التاريخ) ব্যাপক সমাদৃত। গবেষক হিসেবে তার প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে আব্বাসীয় খিলাফতের ওপর তিন খণ্ডের একটি আকর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ এবং সমকালীন প্রেক্ষাপটে রচিত ‘প্যালেস্টাইন: আ শর্ট হিস্ট্রি’। বর্তমানে তিনি তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অবস্থান করে তার গবেষণা ও লেখালেখি পরিচালনা করছেন এবং নিয়মিত তার অফিসিয়াল এক্স (টুইটার) ও ‘আল জাজিরা নেট’ (الجزيرة نت) প্ল্যাটফর্মে ইসলামী ইতিহাস ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণধর্মী কলাম লিখছেন।







Comments