Skip to content

মুসলিম জাতীয়তাবাদঃ উৎপত্তি, বিবর্তন এবং বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা

ভূমিকা

জাতীয়তাবাদের ধারণার শিকড় ইউরোপের ইতিহাসে প্রোথিত। এই ধারণাটি সময়ের সাথে বিবর্তিত হয়ে উপমহাদেশে এসে পৌঁছেছে এবং এখানে ‘হিন্দু ও মুসলিম’ উভয় জাতীয়তাবাদের জন্ম দিয়েছে। মুসলিম জাতীয়তাবাদ বোঝার জন্য প্রথমে জাতীয়তাবাদের সামগ্রিক ধারণাটি বোঝা প্রয়োজন, কারণ মুসলিম জাতীয়তাবাদ জাতীয়তাবাদেরই একটি উপধারা।

জাতীয়তাবাদের ধারণা: একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা

আমরা দৈনন্দিন জীবনে যে শব্দগুলো ব্যবহার করি, তা মূলত আমাদের সময় ও ভৌগোলিক অবস্থান দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে আমরা শব্দগুলোর যে অর্থ অনুধাবন করি, সূচনালগ্নে সেগুলোর অর্থ বা প্রেক্ষাপট হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। এর একটি চমৎকার উদাহরণ হলো “দেশ” শব্দটি। বর্তমানে দেশ বলতে আমরা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, চীন, আমেরিকা বা জার্মানির মতো বিশাল ও সার্বভৌম রাষ্ট্রীয় সীমারেখাকে বুঝে থাকি। কিন্তু যদি আমরা অন্তত একশ বছর বা তারও কিছুটা পেছনে ফিরে যাই, তবে দেখব সে যুগে দেশ বলতে কেবল মানুষের নিজের গ্রাম বা আশপাশের লোকালয়কেই বোঝানো হতো। এমনকি একটি ইউনিয়নকেও তখন পুরোপুরি দেশ ভাবা হতো না। এর চমৎকার প্রমাণ পাওয়া যায় পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের গল্পে। সেখানে দেখা যায়, ময়মনসিংহ থেকে বড় ভাই ঢাকায় যাচ্ছেন বলে ছোট ভাই আকুল হয়ে কান্নাকাটি করছে এবং বলছে, “ভাই তুমি বিদেশে যাচ্ছ, তাড়াতাড়ি ফেরত আইসো।” অর্থাৎ, সেই সময়ে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা শহরে আসাও তাদের কাছে ‘বিদেশযাত্রা’ হিসেবে গণ্য হতো। সুতরাং, আমরা বর্তমানে দেশ বলতে যা বুঝি, সেই ধারণাটি একেবারেই নতুন।

এই আধুনিক রাষ্ট্রীয় বা জাতীয়তাবাদী ধারণার উদ্ভব হওয়ার পূর্বে মানুষের আত্মপরিচয় নির্ধারিত হতো মূলত দুটি নির্দিষ্ট উপায়ে। প্রথমত, তার নিজস্ব স্থানীয় এলাকা বা লোকালয় দিয়ে এবং দ্বিতীয়ত, তার শাসক বা সম্রাটের পরিচয়ে। সেকালের মানুষ নিজেদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলত, “আমি সম্রাট জাহাঙ্গীরের অনুগত প্রজা” বা “আমি নবাব সিরাজুদ্দৌলার অধীনে আছি।” রাজা বা সম্রাটের প্রতি মানুষের এই পরম আনুগত্যের বিষয়টি শুধু আমাদের উপমহাদেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ব্রিটেনের জাতীয় সংগীতেও এই রাজকেন্দ্রিক চেতনার সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। সেখানে “গড সেভ আওয়ার গ্রেসিয়াস কিং” বা “লং লিভ আওয়ার নোবেল কিং” বলে রাজাকে ব্যাপকভাবে মহিমান্বিত করে প্রায় ঈশ্বরতুল্য বা অতিমানবিক এক মর্যাদায় উপস্থাপন করা হয়েছে। একইভাবে, আমাদের উপমহাদেশের ব্রাহ্মীলিপি বা অশোকলিপিতেও এই একই চিত্র ফুটে ওঠে। অশোকের প্রতিটি শিলালিপি শুরু হতো রাজাকে বন্দনা করা একটি নির্দিষ্ট বাক্য দিয়ে— “দেবানাং প্রিয়ানাং প্রিয়াদর্শী রাজা অশোকা”, যার অর্থ হলো দেবতাদের প্রিয় প্রিয়ভাষিণী রাজা অশোক।

মূলত তৎকালীন সমগ্র রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থাটি ছিল সম্পূর্ণভাবে রাজাকেন্দ্রিক। মানুষ রাজার ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে যেত, রাজাকে খাজনা দিত এবং রাজার অধীনে প্রজা হিসেবেই নিজেদের জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকত। কিন্তু ইতিহাসের একপর্যায়ে যখন এই প্রবল প্রতাপশালী রাজপরিবারগুলোর পতন শুরু হলো, তখন সমাজ ও রাষ্ট্রে একটি বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়। রাজার অবর্তমানে এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে কীভাবে একত্রিত করা হবে এবং কোন সুতোয় গেঁথে তাদেরকে চালিত করা হবে— সেই গভীর সংকট ও মৌলিক প্রশ্ন থেকেই মূলত আধুনিক ‘জাতীয়তাবাদ’-এর ধারণার উদ্ভব ঘটে। মানুষ বুঝতে পারে, রাজার অনুপস্থিতিতে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য তাদের নতুন কোনো পরিচয়ের প্রয়োজন, আর সেই পরিচয়টিই হলো জাতীয়তাবাদ।

ইউরোপে জাতীয়তাবাদের উদ্ভব

রাজতন্ত্রের পতন যখন শুরু হলো, তখন ইউরোপের সামনে একটি মৌলিক ও জটিল প্রশ্নের উদয় হলো—দীর্ঘকাল ধরে রাজার শাসনে সন্তুষ্ট থাকা বিপুল সংখ্যক মানুষকে রাজার অবর্তমানে কীভাবে একত্রিত ও পরিচালিত করা যাবে? যুগ যুগ ধরে মানুষ রাজার ডাকে যুদ্ধ করেছে, খাজনা দিয়েছে এবং রাজার পরিচয়েই নিজেদের পরিচিত করেছে। কিন্তু রাজা যখন নেই, তখন এই বিশাল জনসমষ্টিকে এক সুতোয় গাঁথার বিকল্প কোনো উপায় খুঁজতে গিয়েই মূলত জাতীয়তাবাদের ধারণার জন্ম হয়। তাত্ত্বিকভাবে জাতীয়তাবাদের একক কোনো জনকের নাম নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল হলেও, ১৭৪০ বা ১৭৫০-এর দশকে জন্মগ্রহণ করা জার্মান দার্শনিক ইয়োহান গটফ্রিড হার্ডার এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেন। তিনি বলেছিলেন যে, প্রতিটি জাতির নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব সংস্কৃতি এবং নিজস্ব ঐতিহ্য থাকে এবং এই বিষয়গুলোই হলো একটি জাতির মূল প্রাণশক্তি।

ইউরোপে এই ধারণার একটি বড় ধরনের ও বাস্তব প্রয়োগ ঘটে ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে। ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পর ফ্রান্সে সন্ত্রাসের রাজত্ব শুরু হয়। দীর্ঘকাল রাজপরিবারের অধীনে থাকা মানুষ হঠাৎ করে রাজা না থাকায় এক চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে যায়। দশ বছর ধরে চলা এই অরাজকতায় সবাই নিজেদের রাজা ভাবতে শুরু করে, যার ফলে ফ্রান্সে প্রচুর রক্তপাত হয়। এই ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা ও রক্তপাত দূর করতে ফ্রান্সের সেনাবাহিনী ও আমলারা একপর্যায়ে অনেকটা জোর করেই নেপোলিয়ন বোনাপার্টকে ফ্রান্সের মসনদে বসান। ক্ষমতায় এসে এই অরাজকতা সামাল দিতে নেপোলিয়নই প্রথম জাতীয়তাবাদের অত্যন্ত সার্থক ও প্রায়োগিক রূপ দেন। তিনি জনগণকে বোঝান যে রাজার অবর্তমানে তারা তাদের ফরাসি ভাষা এবং তাদের অত্যন্ত ভালোবাসার ফরাসি সেনাবাহিনীর অহংকারকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। এভাবেই তারা একটি অবিচ্ছেদ্য ‘ফরাসি জাতি’ হিসেবে নিজেদের নতুন পরিচয় গড়ে তোলে।

ঐক্যবদ্ধ ফরাসি জাতি গঠন করার পরপরই নেপোলিয়ন ইউরোপ আক্রমণে বেরিয়ে পড়েন এবং পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশ দখল করে নেন। ফ্রান্স যখন রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে এই দেশগুলো দখল করছিল, তখন ইউরোপের অন্যান্য দেশের সাধারণ মানুষ সাংস্কৃতিকভাবে একটি নতুন বিষয় প্রত্যক্ষ করে। তারা দেখতে পায় যে, ফরাসিরা কীভাবে নিজেদের ভাষা ও সেনাবাহিনীর অধীনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এত শক্তিশালী একটি জাতিতে পরিণত হয়েছে। এটি দেখে ইউরোপের অন্যান্য জাতিও উপলব্ধি করতে শুরু করে যে, নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে তারাও ফরাসিদের মতো একত্রিত হতে পারে। এভাবেই ফরাসি জাতি, পলিশ জাতি বা ব্রিটিশ জাতির মতো জাতিগত জাতীয়তাবাদের ঢেউ পুরো ইউরোপ জুড়ে প্রবলভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এই ঐতিহাসিক পটভূমির কারণেই বলা হয়ে থাকে যে, বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বের সামরিক প্রধান যদিও আমেরিকা, কিন্তু তাদের সাংস্কৃতিক প্রধান হলো ফ্রান্স। ফ্রান্স সেই সময় থেকেই পশ্চিমা বিশ্বকে সাংস্কৃতিকভাবে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে।

ফরাসি জাতীয়তাবাদের এই প্রবল ঢেউ খুব দ্রুতই প্রতিবেশী ইংল্যান্ডেও গিয়ে আছড়ে পড়ে। ইংল্যান্ডে ততদিনে ম্যাগনাকার্টা, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট গঠন এবং গৃহযুদ্ধের মতো নানা ধাপ পেরিয়ে রাজতন্ত্র থেকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও প্রধানমন্ত্রী ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে। ফ্রান্সের দেখাদেখি ইংল্যান্ডেও ব্রিটিশ জাতীয়তাবাদ অত্যন্ত শক্ত ও জোরালো রূপ ধারণ করে। তৎকালীন ইংরেজি সাহিত্যে এই ব্রিটিশ জাতীয়তাবাদের প্রমাণ হিসেবে ‘ব্রিটিশ শ্রেষ্ঠত্ব’-এর প্রবল উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। মূলত ১৭০০ সালের পর থেকে ইউরোপে গড়ে ওঠা এই সমস্ত জাতীয়তাবাদের রূপটি ছিল একান্তই ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক জাতিগত জাতীয়তাবাদ।

উপমহাদেশে জাতীয়তাবাদের আগমন

ইউরোপে গড়ে ওঠা এথনিক ন্যাশনালিজমের এই প্রবল ঢেউ একপর্যায়ে আমাদের উপমহাদেশেও এসে পৌঁছায়। আঠারো শতকে ফ্রান্সে যখন জাতীয়তাবাদের এই যুগান্তকারী ঘটনাগুলো ঘটছে, ভারতবর্ষ তখন সরাসরি ব্রিটেনের উপনিবেশ। স্বাভাবিকভাবেই ফ্রান্সের জাতীয়তাবাদের প্রভাব ব্রিটেনে লাগার পর তার সরাসরি ঢেউ এসে লাগে আমাদের উপমহাদেশে। আর এই ঢেউ সর্বপ্রথম এসে আছড়ে পড়ে কলকাতাতে। এর প্রধান কারণ হলো, সে সময়ে সমগ্র ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ছিল কলকাতা।

সেই সময়ের, অর্থাৎ ১৮০০ সালের দিককার বা তার পরবর্তী সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। উপমহাদেশের জাতীয়তাবাদের ইতিহাস বিশ্লেষণে বঙ্কিমচন্দ্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র। তিনি যে কেবল বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস রচনা করেছিলেন তা নয়, বরং বলা হয়ে থাকে যে ইংরেজি সাহিত্যের আদলে তিনি বাংলা সাহিত্য লেখা শুরু করেছিলেন। তার আগে বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। প্রচণ্ড মেধাবী এই মানুষটি প্রথমে ইংরেজি উপন্যাস পড়ে উপলব্ধি করেন যে তিনি বাংলায়ও এই কাজ করতে পারেন।

ইউরোপ থেকে আগত এই জাতীয়তাবাদের শক্তিশালী ঢেউ সরাসরি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গায়েও এসে লাগে। ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের আদর্শে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়ে তিনি একের পর এক উপন্যাস ও গ্রন্থ লিখতে শুরু করেন। এই লেখাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— আনন্দমঠ, দেবী চৌধুরানী, রাজসিংহ, মৃণালিনী এবং কৃষ্ণচরিত্র। এর পাশাপাশি তিনি রচনা করেন ধর্মতত্ত্ব ও কমলাকান্তের দপ্তর। গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁর এই প্রতিটি উপন্যাস এবং বইয়ের মূল লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য ছিল মোটে একটাই— আর তা হলো ভারতবর্ষে একটি হিন্দু রাষ্ট্র গঠন করা। বিশেষ করে তাঁর রচিত ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটিকে তো হিন্দু জাতীয়তাবাদের মূল দলিল হিসেবেই আখ্যায়িত করা হয়। এই বিখ্যাত উপন্যাসেই তিনি ‘বন্দে মাতরম’ গানটি যুক্ত করেছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি হিন্দু আদর্শে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রনীতি নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরেন।

কলকাতাতে বসে বঙ্কিমচন্দ্র যখন হিন্দু রাষ্ট্রের স্বপ্ন নিয়ে এই লেখাগুলো লিখে যাচ্ছেন, তখন সেগুলো ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায়। বঙ্গদর্শন সে সময়ে অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রভাবশালী একটি পত্রিকা ছিল। এর বিস্তৃতি কেবল কলকাতাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং মোটামুটি পুরো ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কাছে বঙ্গদর্শন ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। এই পত্রিকাটির মাধ্যমেই মূলত বঙ্কিমচন্দ্রের হিন্দু জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের চিন্তাধারা তৎকালীন শিক্ষিত হিন্দু সমাজে অত্যন্ত গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিকাশ

১৮৬৭ সালে কলকাতায় হিন্দু মেলা প্রতিষ্ঠিত হয়, যার পেছনে ছিলেন সুরেন্দ্র ঠাকুর, নবগোপাল মিত্রসহ আরও কয়েকজন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম লেখাটি “হিন্দু মেলার উপহার” নামেই পরিচিত ছিল। এই মেলার উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু ধর্মের ভিত্তিতে সমগ্র ভারতকে একত্রিত করা। একই সময়ে নরেন্দ্রনাথ দত্ত, যিনি পরে স্বামী বিবেকানন্দ নামে পরিচিত হন, হিন্দুত্বের মহিমা প্রচার করতে থাকেন।

১৮৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস তাদের কার্যক্রমেও হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে — জাতীয় সংগীত হিসেবে নেওয়া হলো “বন্দে মাতরম”, যে গানে ভারত মাতৃকার পূজা করা হয়। মুসলমানদের পক্ষ থেকে এই গানের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি ছিল, কারণ “বন্দে মাতরম” অর্থ হলো মাকে (দেবী রূপে) বন্দনা করা, যা ইসলামী আকিদার সাথে সাংঘর্ষিক। বছরের পর বছর মুসলমানরা কংগ্রেসকে এই গান পরিত্যাগ করার অনুরোধ করলেও কংগ্রেস কোনো গুরুত্ব দেয়নি।

বাল গঙ্গাধর তিলক এবং ভি. ডি. সাভারকার হিন্দু জাতীয়তাবাদকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিলেন। তাঁরা মারাঠা যোদ্ধা শিবাজিকে সমগ্র হিন্দু জাতির বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পরিকল্পনা করলেন এবং শিবাজি উৎসব শুরু করলেন। সাভারকার বলেছিলেন, শিবাজি ছিলেন একজন হিন্দু যোদ্ধা যিনি মুসলিম সভ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ভারতকে রক্ষা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথও শিবাজি উৎসব উপলক্ষে কবিতা লিখেছিলেন, যেখানে তিনি “এক ধর্মের নামে, এক পূর্ণের নামে” ভারতকে একত্রিত করার আহ্বান জানান। এই ধারা থেকেই পরে হিন্দু মহাসভা, সংঘ পরিবার, আরএসএস এবং বর্তমান বিজেপির জন্ম।

মুসলমানদের পরিস্থিতি ও ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ

উপমহাদেশে মুসলিম জাতীয়তাবাদের প্রকৃত প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে ১৮৫৭ সালের ঐতিহাসিক সিপাহী বিদ্রোহ এবং তার পরবর্তী সময়ে মুসলমানদের চরম বিপর্যয়ের চিত্রটি গভীরভাবে অনুধাবন করা অপরিহার্য। ১৮৫৭ সালের এই প্রবল বিদ্রোহটি মূলত মুসলমানদের নেতৃত্বেই সংঘটিত হয়েছিল, যার বিস্তৃতি ঘটেছিল ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী থেকে শুরু করে সুদূর দিল্লি ও আগ্রা পর্যন্ত। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই তীব্র বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। আর এই ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই উপমহাদেশের মুসলমানরা চূড়ান্তভাবে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। মুসলমানদের এই দুর্দশা অবশ্য রাতারাতি শুরু হয়নি; পলাশীর যুদ্ধের পর তারা প্রথমেই তাদের রাজ্য বা রাজনৈতিক ক্ষমতা হারিয়েছিল এবং পরবর্তীতে হারিয়েছে জমিদারি। এরপর ধীরে ধীরে সরকারি ভাষা পরিবর্তিত হয়ে যায়, যার ফলে মুসলমানদের সরকারি চাকরি ও বিচারব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণও চিরতরে হাতছাড়া হয়ে যায়।

১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের ব্যর্থতার পর ব্রিটিশদের সবচেয়ে বড় আক্রোশ গিয়ে পড়ে মুসলমানদের ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। সে যুগে বাংলার মোটামুটি ৪০ ভাগ ভূমির মালিকানা ছিল মাদ্রাসাগুলোর হাতে। পূর্ববর্তী মুসলিম জমিদার, নবাব ও সুবেদাররা মাদ্রাসাগুলোকে এই বিপুল পরিমাণ লাখরাজ বা করমুক্ত সম্পত্তি দান করেছিলেন, যাতে এই প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকতে পারে এবং নিজস্ব জমির আয় থেকেই পরিচালিত হতে পারে। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার মুসলমানদের আর্থসামাজিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার সুপরিকল্পিত উদ্দেশ্যে এই লাখরাজ সম্পত্তি বাতিল করে দেয়, যার ফলে মাদ্রাসাগুলো তাদের আয়ের উৎস হারিয়ে চরম সংকটে পতিত হয় এবং মুসলমানদের শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে পড়ে।

সব মিলিয়ে ব্রিটিশদের এই ধারাবাহিক দমন-পীড়নের ফলে বাঙালি মুসলমানদের আর্থসামাজিক অবস্থা এতটাই ভয়াবহ রূপ ধারণ করে যে, তৎকালীন ব্রিটিশ ঐতিহাসিক উইলিয়াম হান্টার তাঁর পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত মর্মান্তিক একটি চিত্র তুলে ধরেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের আগে বাংলায় এমন কোনো মুসলমান পরিবার খুঁজে পাওয়া যেত না যাকে দরিদ্র বলা চলে। অথচ কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পরিস্থিতি এতটা করুণ হয়ে দাঁড়ায় যে, পুরো বাংলায় একটি অবস্থাসম্পন্ন বা সচ্ছল মুসলমান পরিবারও আর অবশিষ্ট ছিল না। মুসলমানদের শিক্ষার হার তিন শতাংশেরও নিচে নেমে আসে, তাদের সম্পদের মালিকানা বলতে কিছুই থাকে না এবং দীর্ঘকাল শাসন করা একটি প্রভাবশালী জাতি নিমিষেই চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি হয়ে পড়ে।

মুসলিম লীগের জন্ম ও মুসলিম জাতীয়তাবাদ

১৮৫৭ সালের ভয়াবহ ব্যর্থতা এবং চূড়ান্তভাবে সর্বস্বান্ত হওয়ার পর উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে যখন তীব্র হতাশা ও অস্তিত্ব সংকট নেমে আসে, ঠিক সেই চরম মুহূর্তে পথপ্রদর্শক হিসেবে আবির্ভূত হন স্যার সৈয়দ আহমদ এবং সৈয়দ আমীর আলীর মতো কয়েকজন দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব। তাঁরা মুসলমানদের এই বাস্তব পরিস্থিতিটি বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে, একের পর এক বিদ্রোহ করে এবং ইংরেজি শিক্ষা বর্জন করে মুসলমানরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কোনোভাবেই জয়ী হতে পারেনি; উল্টো তারা সবকিছু হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে। যেহেতু ব্রিটিশরা জয়লাভ করেছে এবং মুসলমানদের নতুন করে বিদ্রোহ করার মতো আর কোনো শক্তিই অবশিষ্ট নেই, তাই আপাতত সরাসরি বিরোধিতা না করে কৌশল পরিবর্তন করাটাই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত। তাঁরা পরামর্শ দিলেন যে, এখন ব্রিটিশদের সাথে কিছুটা সহযোগিতা করে অন্তত নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হবে। এর জন্য মুসলমানদের ইংরেজি শিখতে হবে, ইউরোপীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে এবং ব্রিটিশদের সাথে একটি সুসম্পর্ক গড়ে তুলে নিজেদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতির চেষ্টা করতে হবে। এই বাস্তবসম্মত ও যুগান্তকারী চিন্তাধারা থেকেই শুরু হয় ঐতিহাসিক ‘আলীগড় আন্দোলন’। যদিও সে সময়কার সব মুসলমান এই আন্দোলনকে সমর্থন করেনি, তবে মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশের ওপর এর ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল।

এই আলীগড় আন্দোলনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ও সমর্থক ছিল ঢাকার নবাব খাজা পরিবার। আলীগড় আন্দোলনের সাথে যুক্ত মুসলমান নেতারা— যারা সমাজে তখনও কিছুটা মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মতো অবস্থায় ছিলেন— তারা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন যে হিন্দু সমাজ অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মুসলমানরা এর আগে প্রায় ২০ বছর ধরে কংগ্রেসের সাথে যুক্ত থেকে তাদেরকে বারবার অনুরোধ করেছিল যেন তারা ‘বন্দে মাতরম’ বা হিন্দুত্ববাদী আদর্শগুলো বাদ দিয়ে একটি সর্বধর্মের কাছে গ্রহণযোগ্য সাধারণ নীতি গ্রহণ করে, যাতে মুসলমানরাও স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের সাথে যোগ দিতে পারে। কিন্তু কংগ্রেস মুসলমানদের সেই যুক্তিসঙ্গত দাবিতে একেবারেই কর্ণপাত করেনি।

এই অসহযোগিতামূলক ও বৈরী পরিস্থিতিতে মুসলমানদের সামনে নিজেদের স্বতন্ত্র সত্তা নিয়ে টিকে থাকার আর কোনো বিকল্প উপায় ছিল না। তারা গভীরভাবে উপলব্ধি করলেন যে, হিন্দু জাতীয়তাবাদের আগ্রাসন থেকে নিজেদের বাঁচাতে হলে তাদের নিজেদেরও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো প্ল্যাটফর্ম লাগবে। এই ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রয়োজন থেকেই ১৯০৬ সালে ঢাকার নবাব খাজা সলিমুল্লাহ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান মধুর ক্যান্টিন— যার তৎকালীন নাম ছিল ‘ইশারাত মঞ্জিল’— সেখানে সর্বভারতীয় মুসলিম নেতাদের আমন্ত্রণ জানান। সেই ঐতিহাসিক সমাবেশেই মুসলমানদের নিজেদের অধিকার আদায় ও অস্তিত্ব রক্ষার লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মুসলিম লীগ’ গঠিত হয়।

মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার এই ঘটনাটিকে উপমহাদেশের মুসলিম জাতীয়তাবাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক যাত্রা হিসেবে গণ্য করা হয়। ইতিহাসের এই বাঁকবদলে অত্যন্ত চমকপ্রদ ও মজাদার একটি সমীকরণ লক্ষণীয়। হিন্দু ও মুসলিম— উভয় জাতীয়তাবাদই এই বাংলা ভূখণ্ডে বিকশিত হলেও, হিন্দু জাতীয়তাবাদের সূচনা ও জন্ম হয়েছিল কলকাতায়, আর ঠিক তার বিপরীতে মুসলিম জাতীয়তাবাদের আনুষ্ঠানিক জন্ম হয়েছিল ঢাকায়।

আল্লামা ইকবাল এবং পাকিস্তানের ধারণা

মুসলিম জাতীয়তাবাদের বিকাশে আল্লামা ইকবাল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি জার্মানির মিউনিখ ও হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। ইউরোপে থাকাকালীন তিনি এথনিক জাতীয়তাবাদের ভয়াবহ চরিত্র প্রত্যক্ষ করেন — যে আগুন কিছুদিন পরেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিস্ফোরিত হবে। তিনি এই জাতীয়তাবাদের প্রচণ্ড সমালোচনা করেন।

ইকবাল ছিলেন খোলামনের মানুষ। পশ্চিমের ত্রুটির সমালোচনা করলেও পশ্চিমের জ্ঞানকে তিনি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি নিৎশে, কান্ট ও গ্যেটে দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। তাঁর বিখ্যাত কবিতার ধারণা — “খুদি কো কর বুলন্দ ইতনা” — মূলত নিৎশের Übermensch ধারণারই ইসলামী রূপান্তর। তবে পার্থক্য হলো, নিৎশে খ্রিস্টীয় নৈতিকতাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, আর ইকবাল বলেছিলেন ইসলামী নৈতিকতা মেনে চললেই কেবল আত্মার বিকাশ সম্ভব।

ইকবাল উপমহাদেশে ফিরে এসে মুসলমানদের করুণ অবস্থা দেখলেন। তিনি বুঝলেন যে উসমানীয় খেলাফতের কাঠামোতে উপমহাদেশে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাই তিনি প্রস্তাব দিলেন — উপমহাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলো নিয়ে একটি পৃথক দেশ গঠন করতে হবে। এই চিন্তার বিকাশে রহমত আলী, লিয়াকত আলী খান, শেরে বাংলা ফজলুল হক, খাজা সলিমুল্লাহসহ আরও অনেকের অবদান ছিল।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও পাকিস্তান আন্দোলন

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথম দিকে কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের পক্ষে কথা বলতেন। তাঁর প্রস্তাব ছিল সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশকে “ইউনাইটেড স্টেটস অব ইন্ডিয়া” হিসেবে গঠন করা, যেখানে হিন্দু ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলো আমেরিকার অঙ্গরাজ্যের মতো স্বায়ত্তশাসন পাবে। কিন্তু কংগ্রেস এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জিন্নাহকে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দিল।

এই ঘটনায় জিন্নাহর চোখ খুলে গেল। তিনি উপলব্ধি করলেন যে হিন্দুত্ববাদীরা মূলত ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া সাম্রাজ্যের নতুন সম্রাট হতে চাইছে। আল্লামা ইকবালের সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর জিন্নাহ মুসলিম লীগে যোগ দিলেন। কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন যে, জিন্নাহর মুসলিম লীগে যোগদানের আগে এই আন্দোলন ছিল গদায় লস্করী তালে চলা, কিন্তু জিন্নাহ আসার পর একজন সিপাহসালার এলেন এবং আন্দোলনে নতুন প্রাণ সঞ্চারিত হলো।

পাকিস্তান নামটির প্রস্তাব করেন চৌধুরী রহমত আলী। তাঁর ডায়েরিতে তিনি লিখেছিলেন, “we shall not be crucified on the cross of Hindu Nationalism” — অর্থাৎ মুসলিম জাতীয়তাবাদ হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রতিক্রিয়া হিসেবে গড়ে উঠেছে। পাকিস্তান আন্দোলনের মূল আদর্শটি স্পষ্ট করেছিলেন মুফতি শফি উসমানী। কাশ্মীরের আলেমরা যখন জিজ্ঞেস করলেন পাকিস্তানে কি পূর্ণাঙ্গ ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে, তিনি বললেন — ইসলাম কায়েম হবে কি না বলতে পারব না, কিন্তু তোমাদের মাথার উপরে গান্ধী ও নেহরুকে ঝুলিয়ে রাখা হবে না এবং প্রতিদিন তাদের সামনে মাথা নিচু করতে বাধ্য করা হবে না। এটাই ছিল পাকিস্তান আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি।

মধ্যপ্রাচ্য বনাম উপমহাদেশ: দুই ধরনের আন্দোলন

প্রশ্ন ওঠে, উপমহাদেশে যখন মুসলিম জাতীয়তাবাদ বিকশিত হলো, তখন মধ্যপ্রাচ্যে কেন নজদি আন্দোলনের মতো ধর্মবিশুদ্ধতার আন্দোলন হলো? এর উত্তর হলো — দুই অঞ্চলের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মধ্যপ্রাচ্য মাত্র ৩০-৪০ বছর উপনিবেশিক শাসনে ছিল, কিন্তু আমরা ছিলাম ২০০ বছর। মদিনা থেকে শুরু করে ১৯২০ সাল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে মোটামুটি ধারাবাহিকভাবে মুসলমানরাই শাসন করেছে। সেখানে আন্দোলন ছিল “আমরা যথেষ্ট ভালো মুসলমান না” — এই উপলব্ধি থেকে। কিন্তু উপমহাদেশে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে মুসলমানরা রাজ্য হারিয়েছে, জমিদারি হারিয়েছে, সরকারি চাকরি হারিয়েছে, মাদ্রাসার সম্পদ হারিয়েছে। মুসলমান নাম রাখা যাচ্ছে না, মসজিদ বানানো যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে উপমহাদেশের আন্দোলনের মূল কথা ছিল — “আমি যে মুসলমান, এই পরিচয়টা টিকিয়ে রাখতে হবে।” দেওবন্দ মাদ্রাসা ও তাবলিগ জামাতের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই ইসলামী পরিচয় বাঁচিয়ে রাখার জন্যই গড়ে উঠেছিল।

পাকিস্তান পরবর্তী বাংলাদেশে মুসলিম জাতীয়তাবাদ

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে) মুসলিম জাতীয়তাবাদের উদ্দেশ্য অনেকটা পূরণ হলো। মুসলিম লীগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ছিল জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ। এর মাধ্যমে প্রায় ২০০ বছর পরে প্রথমবারের মতো বাংলার মুসলমানরা ভূমির মালিক হলো।

১৯৭৫ সালের পর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির আবির্ভাব হয়। জিয়াউর রহমান ভাষানী ন্যাপ ও মুসলিম লীগের সদস্যদের একত্রিত করে দল গঠন করলেন। তিনি টেলিভিশনে আযান প্রচলন করলেন, ইসলামী ফাউন্ডেশনকে শক্তিশালী করলেন, সংবিধান থেকে সমাজতন্ত্র বাদ দিয়ে আল্লাহর উপর বিশ্বাস যোগ করলেন এবং মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক গড়লেন। ১৯৭৫ সালের আগে তুরস্ক, সৌদি আরব, ইরাকের মতো মুসলিম দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের তেমন সম্পর্ক ছিল না।

মুসলিম বিশ্বের সাথে এই কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের একটি চমৎকার ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হলো সৌদি আরবে নিম গাছ উপহার দেওয়ার ঘটনাটি। সে সময় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মাধ্যমে গবেষণা করে জানতে পারেন যে, আরবের শুষ্ক মরুভূমিতে নিম গাছ বেশ ভালোভাবে বেড়ে উঠতে এবং দীর্ঘস্থায়ী ছায়া দিতে সক্ষম। এই তথ্যের ভিত্তিতে তিনি সৌদি বাদশাহর জন্য ১০ হাজার নিম গাছের চারা উপহার নিয়ে যান, যা পরবর্তীতে মিনা ও আরাফাতের ময়দানে রোপণ করা হয়। আরবরা এই গাছগুলোকে আজও ‘জিয়া শাজারাহ’ বা জিয়ার গাছ নামে চেনে। এই অভিনব ও দূরদর্শী উপহারে মুগ্ধ হয়ে সৌদি বাদশাহ যখন বাংলাদেশের জন্য সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে চান, তখন জিয়াউর রহমান কোনো আর্থিক অনুদান না চেয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষদের সেখানে কাজের সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ করেন। মূলত এই চমৎকার কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্য দিয়েই মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের বিশাল জনশক্তি রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল।

বিএনপির ১৯৭৮ সালের দলীয় গঠন বক্তৃতায় জিয়াউর রহমান বলেছিলেন — “Bangladeshi nationalism involves Islamic culture, our traditions, for centuries।” গবেষক রওন জাহান লিখেছেন যে জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ছিল ১৯৭১-পূর্ব মুসলিম পরিচিতির একটি আঞ্চলিক রূপ। বিএনপির শীর্ষ নেতা কামাল ইবনে ইউসুফ একবার বলেছিলেন, আমরা বিএনপি করি গত ২০০ বছর ধরে — তিতুমীর, শরীয়তুল্লাহ, খানজাহান আলীর যে ঐতিহ্য, সেটিই বিএনপি ধারণ করে।

জাতীয়তাবাদের নানা রূপ ও ইসলামী অবস্থান

জাতীয়তাবাদকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায় — এথনিক, ভাষিক, সিভিক ও মুসলিম জাতীয়তাবাদ। এথনিক জাতীয়তাবাদ একসময় ভয়াবহ উগ্র রূপ ধারণ করে এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তা বিস্ফোরিত হয়। দুই বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের প্রায় ৩০ ভাগ মানুষ মারা যায়। এই বিপর্যয়ের পর ইউরোপ সিভিক জাতীয়তাবাদে সরে আসে, যেখানে বলা হয় — একই ভূখণ্ডের সব নাগরিক সমান। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের “বাঙালি বাঙালি” ধারণাটি অনেকটা এথনিক জাতীয়তাবাদের কাছাকাছি, আর বিএনপির “বাংলাদেশি” ধারণাটি নাগরিক জাতীয়তাবাদের কাছাকাছি। মুসলিম জাতীয়তাবাদ এই দুই ধারা থেকে আলাদা — এতে জাতি বা ভাষার নয়, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তি। বিদায় হজের ভাষণে রাসূল (সা.) স্পষ্ট বলেছেন, আরবের ওপর অনারবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, সাদার ওপর কালোর নেই। ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সাথে এথনিক বা ভাষিক জাতীয়তাবাদের বিরোধ থাকলেও মুসলিম জাতীয়তাবাদকে বড় আলেমরা একেবারে ইসলামবিরোধী বলে প্রত্যাখ্যান করেননি।

জামায়াতে ইসলামীর পরিবর্তন এবং ভবিষ্যতের রূপরেখা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইসলামপন্থী দলগুলোর, বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আদর্শিক ও কৌশলগত বিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয়। ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতে ইসলামী একটি বা বিশুদ্ধতাবাদী ইসলামী আদর্শ ধারণ করত, যাদের মূল ও প্রত্যক্ষ লক্ষ্য ছিল সরাসরি ইসলামী রাষ্ট্র বা শরিয়া কায়েম করা। কিন্তু গত কয়েক বছরে, বিশেষ করে বিগত দুই-তিন বছরে দলটির রাজনৈতিক ও আদর্শিক চরিত্রে একটি বিশাল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। তারা তাদের আগের সেই আপসহীন ইসলামপন্থী অবস্থান থেকে সরে এসে বর্তমানে অনেকটাই মুসলিম জাতীয়তাবাদের দর্শনের কাছাকাছি অবস্থান নিয়েছে। বর্তমানে জামায়াতে ইসলামী কিংবা তাদের সমমনা নেতারা সরাসরি শরিয়া বা ইসলামী হুকুমত কায়েমের কথা বলছেন না। এমনকি মাওলানা মামুনুল হকের মতো কঠোর ইসলামপন্থী নেতাও প্রকাশ্যে স্বীকার করছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরাসরি শরিয়া কায়েম করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এর পরিবর্তে তাদের বর্তমান রাজনৈতিক কৌশলটি পুরোপুরি মুসলিম জাতীয়তাবাদের মূল প্রবক্তা আল্লামা ইকবাল বা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর চিন্তাধারার সাথে মিলে যায়। তাদের নতুন রূপরেখাটি হলো— প্রথমে রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে হবে, এরপর দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে এবং মানুষকে বোঝাতে হবে কেন ইসলামের বিধিবিধান তাদের জন্য কল্যাণকর। যখন সাধারণ মানুষ ইসলামের এই সৌন্দর্য ও প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরে নিজেরাই তা দাবি করবে, কেবল তখনই পর্যায়ক্রমে ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠিত হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য ইসলামপন্থী দলগুলোর এই রূপান্তর কোনো আদর্শিক বিচ্যুতি নয়, বরং এটি একটি সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত কৌশলগত পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের পেছনে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, গত পনেরো-ষোলো বছর ধরে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে কোনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারেনি এবং তাদের নেতাকর্মীরা চরম দমন-পীড়ন ও নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। রাজনৈতিক ময়দান থেকে দূরে থাকার এই দীর্ঘ সময়টিতে তারা নিজেদের অতীত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা ও আত্মসমালোচনার সুযোগ পেয়েছেন। তারা উপলব্ধি করেছেন যে, গত প্রায় একশ বছর ধরে চেষ্টা করার পরও তাদের কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসেনি, কারণ বাংলাদেশের প্রায় আঠারো কোটি মুসলমানের ধর্মীয় শিক্ষার স্তর ও ধর্মের প্রতি তাদের নিষ্ঠা এমন কোনো পর্যায়ে নেই যে রাতারাতি একটি ইসলামী বিপ্লব বা শরিয়া রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব।

এই অভ্যন্তরীণ উপলব্ধির পাশাপাশি বৈশ্বিক রাজনীতির রূঢ় বাস্তবতাও তাদের এই কৌশলগত পরিবর্তনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে ‘আরব বসন্ত’-এর পর মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামপন্থী দলগুলোর করুণ পরিণতি তাদের জন্য একটি বড় শিক্ষণীয় বিষয় ছিল। মিশরে জামায়াতের আদর্শিক মিত্র ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’ (যাদের দলীয় প্রতীকও জামায়াতের মতো দাঁড়িপাল্লা) ক্ষমতায় আসার পর এক বছরের বেশি টিকতে পারেনি। তিউনিশিয়াতেও ‘আননাহদা’ দলটির একই পরিণতি হয়েছে। নিজেদের আদর্শিক ভাইদের এই চরম ব্যর্থতা দেখে তারা বুঝতে পেরেছেন যে, সরাসরি বিশুদ্ধতাবাদী ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় টেকসই নয়।

এর বিপরীতে তারা তুরস্ক ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোর রাজনৈতিক কাঠামো, বিশেষ করে তুরস্কের রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের কৌশল দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। তুরস্ক একসময় এতটাই কঠোর ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ছিল যে, সেখানে আজান দেওয়ার অনুমতি পর্যন্ত ছিল না এবং ধর্মীয় অনুশাসন পালনের কারণে প্রধানমন্ত্রীকে সেনাবাহিনী কর্তৃক হত্যার শিকার হতে হয়েছিল। কিন্তু এরদোয়ান ক্ষমতায় এসে রাতারাতি কোনো শরিয়া আইন চাপিয়ে দেননি। বরং তিনি অত্যন্ত ধীরগতিতে শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তনের মাধ্যমে তুরস্ককে একটি কট্টর সেকুলার রাষ্ট্র থেকে ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন। তুরস্কের সাধারণ মানুষ হয়তো নিয়মিত নামাজ-রোজা করে না, কিন্তু তাদের মধ্যে এমন একটি সুদৃঢ় মুসলিম পরিচয় তৈরি হয়েছে যে তারা কখনোই শুকরের মাংস খাবে না। ইউরোপ ও তুরস্কে বসবাসরত জামায়াতের বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠী এই ধীর ও টেকসই পরিবর্তনের কাঠামোটি খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং তা দেশের রাজনীতিতে প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন।

সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, এই বাস্তবসম্মত পরিবর্তন শুধু জামায়াতে ইসলামীর ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিতে সক্রিয় অন্যান্য প্রায় সব দলেই এই একই চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের চরমোনাই পীর, খেলাফত মজলিস থেকে শুরু করে আলী হাসান ওসামার মতো অত্যন্ত কট্টর ও বিশুদ্ধতাবাদী হিসেবে পরিচিত ইসলামি চিন্তাবিদরাও এখন একই সুরে কথা বলছেন। তারাও অনুধাবন করেছেন যে, জোর করে ইসলাম কায়েমের চেষ্টা না করে প্রথমে ব্যাপক পড়াশোনা ও আদর্শিক চর্চার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মনোজগতে ইসলামের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে গভীর বোধ তৈরি করতে হবে। সাধারণ মানুষ যখন স্বেচ্ছায় ইসলামের সুফল বুঝতে পারবে, তখনই কেবল টেকসই ইসলামী সমাজ গঠন সম্ভব হবে। মূলত অতীত অভিজ্ঞতা এবং বৈশ্বিক বাস্তবতার আলোকে ইসলামপন্থী দলগুলোর এই কৌশলগত রূপান্তর আধুনিক বাংলাদেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি বাঁকবদল।

জাতীয়তাবাদের ভবিষ্যৎ

জাতীয়তাবাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অবধারিতভাবেই বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক কাঠামো এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের বিষয়টি চলে আসে। আলোচনায় মীর সালমান শামিল একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। রাজনীতি বিজ্ঞানের একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণ হলো— একসময় সমাজতন্ত্র বলতে বোঝানো হতো সোভিয়েত ইউনিয়নকে, আর গণতন্ত্র বলতে বোঝানো হয় আমেরিকাকে। যতদিন বিশ্বমঞ্চে সোভিয়েত ইউনিয়ন পরাশক্তি হিসেবে টিকে ছিল, ততদিন সারা বিশ্বজুড়ে কমিউনিস্ট দলগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। আমাদের অঞ্চলেও এর ব্যাপক প্রভাব ছিল। কিন্তু ১৯৯০ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে, তখন বিশ্ব রাজনীতি থেকে কমিউনিস্ট দেশ এবং দলগুলোও প্রায় বিলীন হয়ে যায়। ঠিক একই যুক্তিতে বর্তমান সময়ের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক তত্ত্ব হলো, যদি ভবিষ্যতে কখনো আমেরিকার পরাশক্তির মর্যাদার পতন ঘটে, তবে তার সাথে সাথে বর্তমান বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটিও সম্ভবত চরম সংকটে পড়বে বা ধসে যাবে।

গণতন্ত্রের এই সম্ভাব্য পতন ঘটলে রাষ্ট্রগুলো বিকল্প হিসেবে কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। ধারণা করা হয়, তখন দেশগুলো আবারও তাদের পুরনো ব্যবস্থা— অর্থাৎ জাতীয়তাবাদ অথবা ধর্মের দিকে ফিরে যাবে। এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশগুলোর ভবিষ্যৎ গতিপথ এক্ষেত্রে মোটামুটি পরিষ্কার। গণতন্ত্র সংকটে পড়লে এশিয়ার দেশগুলো এবং আফ্রিকার একটি বড় অংশ অবধারিতভাবেই ধর্মের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়ার দিকে ঝুঁকে পড়বে।

তবে ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বড় ধরনের অস্পষ্টতা ও জটিলতা রয়েছে। ইউরোপের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক কাঠামো এমন যে, সেখানে মাত্র দুই ঘণ্টা গাড়ি চালালেই নতুন দেশ এবং নতুন ভাষার উদ্ভব হয়। ইউরোপের ইতিহাসে উগ্র এথনিক বা জাতিগত জাতীয়তাবাদের এক ভয়াবহ এবং রক্তক্ষয়ী অতীত রয়েছে। নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের এই উগ্র জাতীয়তাবাদের কারণেই প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের প্রায় ত্রিশ শতাংশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। তাই গণতন্ত্রের পতন হলে ইউরোপ পুনরায় সেই ভয়াবহ এথনিক ন্যাশনালিজমে ফিরে যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ইউরোপের সামনে একদিকে যেমন পুনরায় এথনিক ন্যাশনালিজমে ফিরে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে, তেমনি নিজেদের অতীত রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার কারণে তাদের পুনরায় ধর্মীয় পরিচয়ের (খ্রিস্টান ধর্ম) ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ারও একটি জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, বর্তমানে ইউরোপে যারা উগ্র জাতীয়তাবাদের রাজনীতি করে, তারাও প্রকারান্তরে ধর্মাশ্রয়ী এবং ধর্মের প্রতিই বেশি গুরুত্ব আরোপ করে থাকে।

সামগ্রিকভাবে, গণতন্ত্রের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই জাতীয়তাবাদের ভবিষ্যৎ আসলে শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবে, তা এখনই সুনিশ্চিত করে বলা মুশকিল। তবে এই অনিশ্চয়তা খুব বেশিদিন থাকবে না। ধারণা করা যায়, আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যেই বিশ্বরাজনীতির এই গতিপথ, ক্ষমতার পালাবদল এবং বিশ্বজুড়ে জাতীয়তাবাদের ভবিষ্যৎ রূপটি আমাদের কাছে অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

উপসংহার

মুসলিম জাতীয়তাবাদ কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি সামগ্রিক বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনিবার্য পরিণতি। ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ফ্রান্সে যে আধুনিক এথনিক জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ঘটেছিল, তা ইংল্যান্ড হয়ে আমাদের উপমহাদেশে প্রবেশ করে হিন্দু জাতীয়তাবাদের রূপ ধারণ করে। হিন্দু মেলা, শিবাজী উৎসব, কংগ্রেসের রাজনীতি এবং ‘বন্দে মাতরম’ গানের মধ্য দিয়ে হিন্দুত্ববাদী চেতনা যখন এই ভূখণ্ডে প্রবল হয়ে ওঠে, ঠিক তখনই অস্তিত্বের সংকটে থাকা মুসলমানদের মধ্যে এক প্রবল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে চূড়ান্ত সর্বস্বান্ত হয়ে পড়া মুসলিম সমাজ উপলব্ধি করে যে, নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় নিয়ে টিকতে হলে তাদেরও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মুসলিম জাতীয়তাবাদ মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদের আগ্রাসনেরই একটি শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং ‘পাকিস্তান’ নামের প্রবর্তক চৌধুরী রহমত আলী তাঁর ডায়েরিতে অত্যন্ত চমৎকারভাবে এই অনুভূতিটি তুলে ধরে লিখেছিলেন— মুসলমানরা কোনোভাবেই হিন্দু জাতীয়তাবাদের ক্রুশে বিদ্ধ হতে রাজি নয়।

ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মুসলিম জাতীয়তাবাদের যে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল, পরবর্তীতে আল্লামা ইকবালের সুগভীর তাত্ত্বিক চিন্তাধারায় তা একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। ইউরোপে পড়াশোনা করার সময় সেখানকার উগ্র এথনিক জাতীয়তাবাদের ভয়াবহতা এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ কাছ থেকে দেখার পর ইকবাল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অবিভক্ত ভারতে মুসলমানরা কখনোই স্বাধীন সত্তা নিয়ে টিকতে পারবে না। তিনিই প্রথম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে একটি পৃথক রাষ্ট্র গঠনের সুস্পষ্ট ধারণা দেন। এরপর এই তাত্ত্বিক ধারণাকে বাস্তব ও রাজনৈতিক রূপ দেন কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। একসময়ের হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের অগ্রদূত জিন্নাহ যখন কংগ্রেস নেতাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝতে পারলেন, তখন তিনি মুসলিম লীগে যোগ দেন। তাঁর মতো একজন অত্যন্ত মেধাবী ও ক্যারিশম্যাটিক নেতার আগমনে মুসলিম লীগ অভাবনীয় গতি লাভ করে এবং মুসলমানদের জন্য পৃথক ভূখণ্ডের দাবিটি একটি অপ্রতিরোধ্য আন্দোলনে পরিণত হয়।

মুসলমানদের স্বাধীনভাবে ধর্মপালন, শিক্ষা গ্রহণ এবং জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের মাধ্যমে ভূমির মালিকানা ফিরে পাওয়ার যে স্বপ্ন নিয়ে পাকিস্তান আন্দোলন শুরু হয়েছিল, ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের মধ্য দিয়ে মুসলিম জাতীয়তাবাদের সেই মূল উদ্দেশ্যটি সফল হয়। পরবর্তীতে ঐতিহাসিক নানা কারণে বাংলাদেশ বা পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হলেও, এই ভূখণ্ডের রাজনীতিতে মুসলিম জাতীয়তাবাদের অন্তর্নিহিত ধারাটি কখনোই সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়নি। ১৯৭৫ সালের পর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ প্রতিষ্ঠা করেন, সমাজবিজ্ঞানীদের মতে তা মূলত প্রাক-১৯৭১ সালের মুসলিম পরিচয়েরই একটি প্রতিচ্ছবি ছিল। তিনি সংবিধানে আল্লাহর প্রতি আস্থা স্থাপন, মুসলিম বিশ্বের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে রাষ্ট্রীয় পরিসরে ফিরিয়ে এনে এই চেতনাকে সুসংহত করেন। এমনকি বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলোও, যারা একসময় আপসহীন ইসলামপন্থায় বিশ্বাস করত, পরিবর্তিত বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতায় বাস্তবসম্মত কারণে তাদের কৌশল পরিবর্তন করেছে। তারা এখন সরাসরি শরিয়া কায়েমের কথা না বলে মুসলিম জাতীয়তাবাদের কাঠামোর কাছাকাছি অবস্থান নিচ্ছে।

জাতীয়তাবাদের ভবিষ্যৎ গতিপথ বর্তমানে একটি অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে। একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সাথে সাথে যেমন বিশ্ব থেকে সমাজতন্ত্রের প্রভাব প্রায় মুছে গিয়েছিল, তেমনি আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের ধারণা— ভবিষ্যতে যদি কখনো আমেরিকার নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতন ঘটে, তবে বিশ্ব রাজনীতিতে আবার এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হবে। তখন এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলো সম্ভবত আবারও ধর্মের ভিত্তিতে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করবে। অন্যদিকে ইউরোপ তাদের পুরনো এথনিক জাতীয়তাবাদে ফিরে যাবে, নাকি ধর্মকে আঁকড়ে ধরবে— তা নিয়ে প্রবল সংশয় রয়েছে। বিশ্বরাজনীতির এই পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্র ও নাগরিক জাতীয়তাবাদের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই অনিশ্চিত। আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যেই বৈশ্বিক রাজনৈতিক কাঠামোর এই পরিবর্তনগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করবে এবং তখনই বোঝা যাবে মুসলিম জাতীয়তাবাদ ভবিষ্যতে কোন নতুন রূপ বা মাত্রায় আবির্ভূত হবে।

শ্রুতিলিখনঃ
শাহেদ হাসান
রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, দ্য মুসলিম মাইন্ডস

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *