Skip to content

তেলাপোকাদের রাজনীতি: সামনে কি অপেক্ষা করছে?

একটি ব্যঙ্গাত্মক দলের উত্থানে কাঁপছে ভারতের রাজনীতি। বাংলাদেশের জুলাই যে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল, ভারতের ককরোচ পার্টির ভবিষ্যৎও নির্ভর করছে সেই শিক্ষা বুঝতে পারার ওপর।

২০২৬ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারপতি এমন একটি মন্তব্য করলেন, যা হয়তো তাঁর কাছে ছিল ক্ষণিকের বিরক্তির বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু সেই মন্তব্যই কয়েক দিনের মধ্যে এক নতুন রাজনৈতিক প্রতীকের জন্ম দিল। আদালত অবমাননার একটি মামলার শুনানির সময় বিচারপতি সূর্য কান্ত বেকার তরুণদের একটি নির্দিষ্ট অংশকে ‘তেলাপোকা’ বলে অভিহিত করেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, এরা এমন এক শ্রেণির মানুষ, যারা কোনো পেশাগত জায়গা তৈরি করতে না পেরে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অ্যাক্টিভিজমের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তারপর সবার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে শুরু করে।

সাধারণত এ ধরনের মন্তব্য এক দিনের উত্তেজনার বেশি স্থায়ী হয় না। সংবাদমাধ্যমে কয়েকটি শিরোনাম হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু বিতর্ক তৈরি হয়, তারপর নতুন কোনো ঘটনার ভিড়ে সেটি হারিয়ে যায়। কিন্তু এবার ঘটল উল্টো কিছু। বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যেই অপমানের ভাষা প্রতিবাদের ভাষায় পরিণত হলো।

ত্রিশ বছর বয়সী পাবলিক রিলেশনস স্নাতক অভিজিৎ দীপক সেই শব্দটিকেই তুলে নিলেন, যেটি দিয়ে তাকে এবং তার প্রজন্মকে ছোট করা হয়েছিল। তিনি ঘোষণা করলেন ‘দুনিয়ার সমস্ত তেলাপোকাদের’ জন্য একটি প্ল্যাটফর্মের কথা। নামটি ছিল হাস্যরসাত্মক, এমনকি ইচ্ছাকৃতভাবেই আত্মবিদ্রূপপূর্ণ। যোগ দেওয়ার শর্তগুলোও ছিল সেই একই সুরে তৈরি। সদস্যকে হতে হবে বেকার, অলস, সারাক্ষণ অনলাইনে থাকা এবং পেশাদারভাবে ক্ষোভ প্রকাশে দক্ষ। যে পরিচয় সমাজের চোখে অপমানের, সেটিকেই তারা নিজেদের পরিচয়ের প্রতীকে পরিণত করল।

ইতিহাসে অপমানিত গোষ্ঠীর জন্য এটি নতুন কোনো কৌশল নয়। যে শব্দ দিয়ে কাউকে নিচে নামানো হয়, অনেক সময় সেটিই একসময় প্রতিবাদের পতাকা হয়ে ওঠে। তেলাপোকা শব্দটির ক্ষেত্রেও ঠিক সেটিই ঘটল।

এরপর যা ঘটল, তাকে আর নিছক ইন্টারনেটের রসিকতা বলে উড়িয়ে দেওয়া গেল না। নরেন্দ্র মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টির নামের ব্যঙ্গাত্মক প্রতিধ্বনি হিসেবে তৈরি ককরোচ জনতা পার্টি মাত্র তিন দিনের মধ্যে ইনস্টাগ্রামে ত্রিশ লাখ অনুসারী সংগ্রহ করল। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে গেল দুই কোটি। এটি ছিল আধুনিক রাজনৈতিক যোগাযোগের এক অদ্ভুত দৃশ্য। একটি দল, যার কোনো নির্বাচনী প্রতীক নেই, কোনো প্রার্থী নেই, এমনকি প্রচলিত অর্থে কোনো রাজনৈতিক কাঠামোও নেই, সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতায় নেমে গেল। ক্ষমতাসীন বিজেপি এবং প্রধান বিরোধী দল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের মতো বিশাল সংগঠনগুলোকেও অনলাইনে পেছনে ফেলে দিল একটি ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ।

কিন্তু ডিজিটাল জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো, তা কি স্ক্রিনের বাইরে যেতে পারবে? ককরোচ জনতা পার্টির ক্ষেত্রে উত্তরটি ছিল হ্যাঁ। খুব দ্রুত আন্দোলন ভার্চুয়াল জগতের বাইরে চলে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের প্রতিবাদে সমর্থকেরা দিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থান নেয়। তাদের প্রধান দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। সংসদ ভবনের দিকে এগিয়ে যাওয়া একটি মিছিলে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে। একই সময়ে শিক্ষক ও অ্যাক্টিভিস্ট সোনম ওয়াংচুকের অনশনও উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। তাঁকে জোরপূর্বক হাসপাতালে নেওয়া হয়। আর এই পরিবেশের মধ্যেই অভিজিৎ দীপক নিজেও অনশনে বসেন।

একটি ব্যঙ্গাত্মক নামের আড়ালে শুরু হওয়া উদ্যোগ তখন আর কেবল ব্যঙ্গ ছিল না। সেটি হয়ে উঠেছিল এক প্রজন্মের জমে থাকা হতাশা প্রকাশের একটি নতুন মাধ্যম। প্রশ্ন ছিল, এই শক্তি কি কেবল প্রতিবাদের ভাষা হয়ে থাকবে, নাকি কোনো একসময় বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিতে পারবে?


যে রসিকতা আর রসিকতা রইল না

সিজিপিকে নিছক ইন্টারনেটের একটি মিম বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু তাতে বিষয়টিকে খুব ছোট করে দেখা হবে। দলটির নাম ব্যঙ্গাত্মক, কিন্তু তাদের ক্ষোভ মোটেও মিথ্যে নয়। প্রতিবছর ভারত এমন এক অর্থনীতিতে লাখ লাখ স্নাতক তৈরি করছে, যেখানে তাদের জন্য পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ নেই। অথচ তাদের ভবিষ্যৎ আটকে যাচ্ছে এমন সব প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ওপর, যেগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

এই হতাশ, ডিগ্রিধারী ও বেকার তরুণ প্রজন্মকে যখন একজন বিচারক ‘পরজীবী’ বলে অভিহিত করেন, তখন তিনি তাদের জন্য কোনো বাস্তবতা তৈরি করছেন না। বরং অবজ্ঞার সঙ্গে সেই বাস্তবতার ওপর একটি অপমানজনক নাম চাপিয়ে দিচ্ছেন। দীপকের কৌশল ছিল ঠিক এখানেই। সে গালিটা অস্বীকার করেনি, বরং নিজের পরিচয়ের অংশ করে নিয়েছে। অপমানকে পরিচয়ে রূপান্তর করা, অপমানিত মানুষের ইতিহাসে এটি এক পুরোনো কৌশল।

এ কারণেই আন্দোলনের এই অসংগঠিত রূপটিই এক ধরনের আয়না হয়ে উঠেছে। এর কোনো উল্লেখযোগ্য ইশতেহার নেই, নেই প্রার্থীদের তালিকা, নেই নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন। দাবিগুলো অনেক সময় রসিকতার মোড়কে আসে, স্লোগানগুলোও আত্মবিদ্রূপে ভরা। যেমন, “অলস আর বেকারদের কণ্ঠস্বর।” কিন্তু এই হাস্যরসের আড়ালেও রয়েছে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু গভীর অভিযোগ। প্রশ্নফাঁস, বেকারত্ব, ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে দেখা এবং এমন এক বিচারব্যবস্থার অভিযোগ, যা তরুণদের সমস্যাকে গুরুত্বের সঙ্গে না দেখে তুচ্ছ করে। সিজিপি দীর্ঘ তর্কে যায় না। তারা শুধু একটি বিষয়কে সামনে তুলে ধরে। আর অসংখ্য মানুষ বুঝে নিয়েছে, সেই ইঙ্গিত কোন দিকে।

রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া: ‘পরিমিত দমননীতি’

রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াকে একজন বিশ্লেষক বলেছেন ‘পরিমিত দমননীতি’। অর্থাৎ একদিকে পুরোপুরি স্বীকৃতি দেওয়া নয়, অন্যদিকে সরাসরি কঠোর দমনেও না যাওয়া। বরং কিছু সীমাবদ্ধতা আরোপ করা, চারপাশে নজরদারি রাখা এবং অপেক্ষা করা যে আন্দোলনটি হয়তো সময়ের সঙ্গে নিজের ভেতর থেকেই দুর্বল হয়ে পড়বে। দীপকের অভিযোগ, সরকার দলটির ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিয়েছে এবং তাদের অ্যাকাউন্টে হস্তক্ষেপ করেছে। একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক উদ্যোগ যখন রাষ্ট্রের এতটা মনোযোগ আকর্ষণ করে, তখন বোঝা যায় যে সেই ব্যঙ্গটি কোথাও গিয়ে আঘাত করেছে।


ঢাকার শিক্ষা

সিজিপির ভবিষ্যৎ বুঝতে হলে একটু পূর্ব দিকে তাকাতে হবে। বাংলাদেশের দিকে। সেখানে তরুণদের একটি বিদ্রোহ কেবল কোটা আন্দোলন হিসেবেই থেমে থাকেনি। তা অনলাইনেও আটকে থাকেনি, শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণও থাকেনি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া একটি ছাত্র আন্দোলন মাত্র এক মাসের মধ্যে জেন-জির প্রথম সফল গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। শেখ হাসিনার পনেরো বছরের শাসনের অবসান ঘটে। তিনি দেশ ছেড়ে চলে যান, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সংঘাতে প্রাণ হারান এক হাজারেরও বেশি মানুষ।

সিজিপির সঙ্গে এর মিল কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। দুই ক্ষেত্রেই পরীক্ষার প্রশ্নের আড়ালে ছিল কর্মসংস্থানের সংকট, আর সেই সংকটই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছিল। দুটি আন্দোলনের চালিকাশক্তি ছিল ডিজিটাল যুগে বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্ম। বাংলাদেশে যাদের বয়স পঁয়ত্রিশের নিচে, তারাই দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি। মিম, গান এবং দ্রুত সংগঠিত হওয়ার নতুন ভাষায় তারা স্বচ্ছন্দ। আর দুটি আন্দোলনই শুরুতে ইচ্ছাকৃতভাবেই কোনো একক নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করেনি।

কিন্তু বাংলাদেশের গল্প সেখানে শেষ হয়নি। এরপরের অধ্যায়টিও তারা দেখেছে। তারা রাজপথে জয় পেয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো জিনিসটাকে ভিন্ন দিকে ধাবিত করে।

জুলাই ২০২৪

কোটাব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন শুরু, এক মাসের মধ্যে গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তর। শেখ হাসিনার পতন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন।

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী। একই সঙ্গে ‘জুলাই ন্যাশনাল চার্টার’-এর ৮৪ দফা সংস্কার প্রস্তাবে গণভোট, প্রায় ৭৩ শতাংশ সমর্থন।

কাগজে দেখলে মনে হতে পারে, বিপ্লব তার কাঙ্ক্ষিত পরিণতিতে পৌঁছেছে। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে, জনসমর্থনের ভিত্তিতে সংস্কারের পথও তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ক্ষমতা ফিরে গেছে সেই পরিচিত রাজনৈতিক পরিবারগুলোর কাছেই, যাদের সরাতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছিল।

যে প্রজন্ম একজন স্বৈরশাসককে ক্ষমতা থেকে সরিয়েছিল, ইতিহাস তাকে মনে রেখেছে ঠিকই। কিন্তু এমন এক নৈতিক সাক্ষী হিসেবে, রাষ্ট্র পরিচালনার উপযুক্ত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নয়।

এই আশঙ্কাই দিল্লির তেলাপোকাদের ভাবিয়ে তোলা উচিত। তীব্র গণতান্ত্রিক জনআন্দোলন যখন তৈরি হয়, তখন তা দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার বৈধতা দুর্বল করে দেয়। কিন্তু এরপর আসে আরও কঠিন কাজ, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে গড়ে তোলা। আর সেই পর্যায়েই অনেক আন্দোলন হোঁচট খায়। তখন স্থিতিশীলতা ও শাসনক্ষমতার যুক্তি তুলে পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলো আবার জায়গা করে নেয়। বিপ্লবের এই দুর্বলতাকে কেউ অস্বীকার করে না। বরং অনেক সময় তাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, স্মরণ করা হয়, এমনকি উদ্‌যাপনও করা হয়। কিন্তু এমনভাবে, যাতে তার ভেতরের পরিবর্তনশক্তি ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে যায়। একটি জীবন্ত রাজনৈতিক ঘটনাকে নিরাপদ ঐতিহাসিক স্মৃতিতে পরিণত করা হয়। কখনো কখনো বিপ্লবকে হত্যা করা হয় তাকে সম্মান জানাতে জানাতেই।


নেতাহীনতা যেমন শক্তি, তেমন শিকল

সিজিপি যে কারণে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে, সেই কারণটিই আবার তার রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণটি হলো কাঠামোর বাইরে থাকার তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। যে আন্দোলনের কোনো সদস্য তালিকা নেই, তাকে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। কিন্তু একই কারণে তার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা বা দরকষাকষিও কঠিন হয়ে পড়ে। যে আন্দোলনের কোনো নির্দিষ্ট কর্মসূচি নেই, তাকে সহজে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আনা যায় না। কিন্তু সেই আন্দোলনের পক্ষে রাষ্ট্র পরিচালনার মতো দায়িত্বও নেওয়া কঠিন।

সিজিপির প্রতিষ্ঠাতা পেশায় একজন কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজিস্ট। একসময় তিনি আম আদমি পার্টির সঙ্গে কাজ করেছেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে সমালোচকদের একাংশ দাবি করেন, পুরো উদ্যোগটি হয়তো বিরোধী রাজনীতির একটি কৌশল। অভিযোগটি সত্য হোক বা না হোক, এর মধ্য দিয়ে একটি বাস্তব সমস্যা সামনে আসে। নেতাহীন কোনো আন্দোলন যখন একটি পরিচিত মুখ পেয়ে যায়, তখন তাকে আক্রমণের লক্ষ্য বানানো সহজ হয়ে ওঠে। আবার আন্দোলনকে সফল করতে হলে যখন দাবিগুলো আরও নির্দিষ্ট করতে হয়, তখন ধীরে ধীরে তৈরি করতে হয় সংগঠন, কমিটি এবং নেতৃত্বের কাঠামো। শুরু হয় নানা ধরনের সমঝোতা। আর তখনই হারিয়ে যেতে পারে সেই স্বতঃস্ফূর্ততা, যার আকর্ষণে মানুষ প্রথমবার রাস্তায় নেমেছিল।

বাংলাদেশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনও এই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল। তারা একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছিল, জাতীয় নাগরিক দল বা এনসিপি। পাশাপাশি কিছু আনুষ্ঠানিক অর্জনও তাদের ছিল। একটি নির্বাচন, একটি সনদ এবং একটি গণভোট। প্রতিটিই ছিল বাস্তব। কিন্তু কোনোটিই তাদের হাতে সরাসরি ক্ষমতা তুলে দিতে পারেনি। কারণ পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এমন কিছু শক্তি ছিল, যা তরুণদের আন্দোলনের কাছে ছিল না। ছিল দীর্ঘদিনের সংগঠন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক এবং বহু বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার ফলে তৈরি হওয়া এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা। ব্যালটের ফলাফল দেখিয়ে দিল, প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির সুবিধা শেষ পর্যন্ত পুরোনো শক্তির পক্ষেই কাজ করেছে, নতুন আন্দোলনের পক্ষে নয়।

তবে এখান থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কোনো কারণ নেই যে তরুণদের বিদ্রোহ সবসময় ব্যর্থ হয়। বরং শিক্ষা হলো, তারা পরিবর্তনের মুহূর্ত তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তনকে টিকিয়ে রাখার জন্য যে দীর্ঘ ও ধৈর্যের প্রতিষ্ঠান নির্মাণ প্রয়োজন, সেখানে তারা পিছিয়ে পড়ে। যদি না তারা আগে থেকেই সেই প্রস্তুতি নিতে পারে।

সিজিপির সামনে অবশ্য এমন একটি বাড়তি চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ছিল না। শেখ হাসিনার সরকার দীর্ঘ পনেরো বছরে ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক বৈধতা হারিয়েছিল। ২০২৪ সালের মধ্যে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যেখানে কোটা আন্দোলন শুধু একটি স্ফুলিঙ্গের কাজ করেছে। কিন্তু ২০২৬ সালের ভারত এখনো সেই অবস্থায় পৌঁছায়নি। মোদী সরকারের এখনো শক্তিশালী নির্বাচনী ভিত্তি রয়েছে। ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো নানা চাপের মধ্য দিয়ে গেলেও এখনো কার্যকর।

একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক উদ্যোগ ক্ষমতাসীনদের অস্বস্তিতে ফেলতে পারে, তাদের সমালোচনার মুখে দাঁড় করাতে পারে। কিন্তু হতাশ তরুণদের বাইরে যে বিশাল ভোটারসমাজ এখনো সরকারকে সমর্থন করে, তাদের সমর্থন অতিক্রম করা সহজ নয়। তাই সিজিপির পথ হয়তো সরাসরি নির্বাচনী ক্ষমতার দিকে যাবে না। বরং এটি হয়তো একটি সাংস্কৃতিক শক্তি হিসেবেই টিকে থাকবে। হয়তো কখনো সরকার গঠন করবে না, ক্ষমতার অংশীদারও হবে না। কিন্তু ক্ষমতার দিকে তাকিয়ে থাকা এক স্থায়ী, ব্যঙ্গাত্মক কণ্ঠস্বর হিসেবে তার অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারে।


বিদ্রোহের অভিন্ন ব্যাকরণ

এই ঘটনাগুলোকে দুটি আলাদা দেশের বিচ্ছিন্ন গল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে তরুণদের অসন্তোষ ও বিদ্রোহের যে নতুন ধারা তৈরি হচ্ছে, তার মধ্যে একটি অভিন্ন ছন্দ খুঁজে পাওয়া যায়। নেপালে তার প্রকাশ দেখা গেছে, তারও আগে দেখা গেছে শ্রীলঙ্কায়। আর এখন উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে একই ধরনের প্রশ্ন বারবার ফিরে আসছে।

যে প্রজন্মকে মেধা, পরিশ্রম এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তাদের একটি বড় অংশ আজ দাঁড়িয়ে আছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে। একই সঙ্গে তারা দেখছে, কীভাবে পরিবারতন্ত্র, রাজনৈতিক আনুগত্য এবং পৃষ্ঠপোষকতার জাল ক্ষমতাকে নিজেদের নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করে দেয়। মেধার নিরপেক্ষ মূল্যায়নের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হওয়ার কথা ছিল পরীক্ষা। কিন্তু সেই পরীক্ষাব্যবস্থাই এখন পরিণত হয়েছে অসন্তোষের প্রতীকী কেন্দ্রে। কারণ এখানেই যোগ্যতা ও ন্যায্যতার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার ভাঙন সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

দেশ / আন্দোলন সংকটের কেন্দ্রবিন্দু রাষ্ট্রের ভিত ও ফলাফল
বাংলাদেশ — কোটা সংস্কার আন্দোলন চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থা দীর্ঘদিনের চাপে দুর্বল হয়ে পড়া শাসনব্যবস্থা ভেতর থেকেই ভেঙে পড়ে; সরাসরি সংঘাত ও গণঅভ্যুত্থান
ভারত — ককরোচ জনতা পার্টি প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি শক্তিশালী নির্বাচনী ভিত্তি এখনো অক্ষত; সরাসরি সংঘাতের বদলে ব্যঙ্গ ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের পথ

বাংলাদেশের কোটা সংস্কার আন্দোলন, ভারতে প্রশ্নফাঁস নিয়ে ক্ষোভ এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ পার্টির আন্দোলন আসলে একই সংকটের ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ। পার্থক্য শুধু এই যে, কোন রাষ্ট্রের ভিত কতটা শক্ত, তার ওপর নির্ভর করে সেই ক্ষোভ কোন পথে প্রকাশ পায়। শেখ হাসিনার শাসনব্যবস্থা দীর্ঘদিনের চাপের ফলে ভেতর থেকেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ব্যক্তিকেন্দ্রিক আনুগত্যের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছিল, যেখানে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই কাঠামো ভেঙে পড়ে।

মোদীর ক্ষমতাকাঠামো এখনো সে পর্যায়ে পৌঁছায়নি। আর এ কারণেই ভারতের এই তরুণ প্রতিবাদ এখনো সরাসরি সংঘাতের পথে যায়নি। বরং তারা বেছে নিয়েছে ব্যঙ্গকে। ব্যঙ্গ তাদেরই অস্ত্র, যারা বুঝতে পারে যে নির্বাচনী শক্তিতে পরিণত হওয়ার আগে তাদের সবচেয়ে বড় প্রভাব তৈরি হয় সংস্কৃতির ভেতর। যখন সরাসরি ক্ষমতার সঙ্গে লড়াই করার পথ সীমিত হয়ে আসে, তখন হাসি ও বিদ্রূপের মাধ্যমেই ক্ষমতার গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো যায়।

এই কারণেই ককরোচ পার্টিকে জুলাই অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত মুহূর্তের সঙ্গে পুরোপুরি তুলনা করা যায় না। বরং এটি মনে করিয়ে দেয় সেই দীর্ঘ সময়ের কথা, যখন বছরের পর বছর ব্যঙ্গ, সমালোচনা ও জনঅসন্তোষ ধীরে ধীরে একটি বড় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করেছিল।


সামনে কী?

তাহলে ককরোচ পার্টির সামনে কী অপেক্ষা করছে? তিনটে সম্ভাব্য পথ ভাবা যায় যার কোনোটাই শুনতে মধুর লাগবে না।

প্রথম পথ: প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠা

নিবন্ধন করা, প্রার্থী দেওয়া, কর্মীবাহিনী গড়ে তোলা—এসব করতে গিয়ে তারা হয়তো সেই ব্যবস্থারই অংশ হয়ে দাঁড়াবে, যাকে এতদিন ব্যঙ্গ করেছে। দলের শৃঙ্খলায় বাঁধা পড়তে গিয়ে অনলাইনে ডুবে থাকা সেই অনুগত ভক্তদেরও হয়তো হারাবে। এটা আম আদমি পার্টির পথ। এই পার্টি এককালে এক দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ছিল, যা পরে সরকার গঠন করেছিল। তারপর হয়ে উঠেছিল আর দশটা সরকারের মতোই। টিকে থাকার দাম মেটাতে গিয়ে তাদের ব্যঙ্গ আর স্বতঃস্ফূর্ততা দুটোই বিসর্জন দিতে হয়েছিল।

দ্বিতীয় পথ: হারিয়ে যাওয়া

‘পরিমিত দমননীতি’ কাজে লেগে যাবে, জোট ভাঙবে, আর অ্যালগরিদম ছুটবে নতুন উত্তেজনার দিকে। তখন সিজিপি সেই দীর্ঘ তালিকার আরেকটি নাম হয়ে থাকবে, যারা কিছুদিন খবরের কাগজের শিরোনামে স্থান পেয়েছিল, তারপর আর কিছুই করতে পারেনি। ভেতরে ক্ষোভ থেকে যাবে, কিন্তু ক্ষোভের বাহনটা থাকবে না।

তৃতীয় পথ: চাপ প্রয়োগকারী শক্তি হয়ে টিকে থাকা

তারা কখনো দল হবে না, সরকারও গড়বে না। কিন্তু এমন এক স্থায়ী ভাষায় পরিণত হবে, যার মাধ্যমে একটি প্রজন্ম জানিয়ে দেবে তারা বিদ্যমান ব্যবস্থার কোন কোন বিষয় মেনে নেবে না। সম্ভবত এটাই সবচেয়ে বাস্তব পরিণতি। আর এই অর্জনটাও একদম ছোট নয়। জনপরিসরে কোন কথা বলা যাবে আর কোনটা যাবে না, সেই সীমানা বদলাতে সব শক্তিকে নির্বাচনে জিততে হয় না। সিজিপি এরই মধ্যে ‘তেলাপোকা’ শব্দটাকে গালি থেকে গর্বে বদলে দিয়েছে। পরীক্ষা আর চাকরির সংকটকে এনে দাঁড় করিয়েছে এমন জায়গায়, যা আর এড়ানো যায় না। এ জয় ব্যালট বাক্সে মাপা যায় না।

বাংলাদেশের জুলাই প্রজন্ম এই তিন পথের সঙ্গেই পরিচিত। প্রথম পথের তিক্ত স্বাদ তারা এরই মধ্যে পেয়ে গেছে। রাজপথে যা জেতা যায়, সব তারা জিতেছিল। তারপর বুঝেছিল, রাজপথ আর রাষ্ট্র এক নয়। সনদ পাস হয়েছিল। কিন্তু যারা রাস্তায় রক্ত দিয়েছিল, ক্ষমতা তাদের হাতে আসেনি।

ককরোচ পার্টি যদি শুধু আয়না হয়ে থাকতে না চায়, তবে তাদের এমন এক সমস্যার সমাধান করতে হবে, যা জুলাই অভ্যুত্থান পারেনি। পুরোনো ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মুহূর্তের বিপুল শক্তিকে কীভাবে প্রতিষ্ঠানের কাঠখোট্টা কাঠামোর ভেতর নেওয়া যায়, যাতে প্রতিষ্ঠান সেই শক্তিকে গিলে না ফেলে, সেটাই এখন তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই সমস্যার সমাধান ব্যঙ্গ দিয়ে হয় না। বরং ব্যঙ্গের জন্মই হয়েছে সমস্যাগুলোর দিকে আঙুল তুলে দেওয়ার জন্য।

তেলাপোকা তাদের নিখুঁত প্রতীক। এর পেছনে কারণও আছে। এটা এমন এক প্রাণী, যে যেকোনো পরিস্থিতিতে টিকে যায়। ক্ষমতা বারবার তাকে মুছে ফেলতে চায়, কিন্তু পারে না। জুতোর আঘাত খেয়েও সে বেঁচে থাকে।

ভারতের এই তেলাপোকারা শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার ঘর দখল করবে, নাকি শুধু নিশ্চিহ্ন হওয়ার বিরুদ্ধে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবে, তা সময়ই নির্ধারণ করবে।

কিন্তু একটি সত্য তারা এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে, যা প্রধান বিচারপতি হয়তো কখনো মেনে নিতে চাননি। তা হলো: এই জেনজিদের সহজে মুছে ফেলা যাবে না। এখন দেখার বিষয়, এই টিকে থাকার শক্তিকে তারা কীভাবে ব্যবহার করে। তারা কি নতুন কোনো পথ নির্মাণ করবে, নাকি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে, কিংবা একটি প্রজন্মের বিবেকের ভাষা হয়ে থেকে যাবে? আগামী দুই বছরেই সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *