দর্শনের গুরত্ব || বারট্রান্ড রাসেল

দর্শনের মূল পরিচয়টা আসলে কী, আর কেনই-বা এটি আমাদের পড়া উচিত? প্রশ্নটি তোলা বিশেষ প্রয়োজন। কারণ বিজ্ঞান কিংবা বৈষয়িক কর্মজগতের প্রভাবে অনেকেই আজ সন্দেহ প্রকাশ করেন: দর্শন কি শুধুই কিছু নিষ্ফল কূটতর্ক কিংবা অহেতুক চুলচেরা বিশ্লেষণ? এমন সব জটিল বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানো, যেসব প্রশ্নের অমীমাংসিত উত্তর হয়তো কোনোদিনই মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয়?
দর্শনের প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠার পেছনে দুটি কারণ রয়েছে: প্রথমত, জীবনের মূল লক্ষ্য সম্পর্কে আমাদের ভুল ধারণা; আর দ্বিতীয়ত, দর্শন ঠিক কী ধরনের কল্যাণ সাধন করতে চায়, তা বুঝতে না পারা।
ভৌতবিজ্ঞান নানা আবিষ্কারের মাধ্যমে এমন বহু মানুষের উপকারে আসে, যারা বিজ্ঞানের ‘ব’-ও জানেন না। ফলে বিজ্ঞানের চর্চা কেবল শিক্ষার্থীর নিজের মনের ওপরই প্রভাব ফেলে না, বরং সামগ্রিকভাবে মানবজাতির কল্যাণ সাধন করে। বিজ্ঞানের উপযোগিতা তাই সর্বজনীন।
কিন্তু দর্শনের উপযোগিতা ঠিক এই ধরনের নয়। যে মানুষ দর্শনচর্চা করে না, দর্শনের কোনো প্রত্যক্ষ প্রভাব তার জীবনে পড়ে না। দর্শনের যদি আদৌ কোনো মূল্য থেকে থাকে, তবে তা পরোক্ষ। যিনি এটি চর্চা করছেন, তাঁর জীবনের ওপর এর প্রভাবের মধ্য দিয়েই কেবল তা প্রকাশিত হয়।
দর্শনের মূল সার্থকতা যদি খুঁজতেই হয়, তবে তা খুঁজতে হবে মানুষের মন ও চিন্তার ওপর এর প্রভাবের ভেতরেই।
তবে দর্শনের মূল সার্থকতা অনুধাবনে ব্যর্থ না হতে চাইলে আমাদের মনকে প্রথমেই তথাকথিত ‘ব্যবহারিক’ বা ‘বস্তুবাদী’ মানুষদের সংস্কার থেকে মুক্ত করতে হবে। প্রাত্যহিক জীবনের পরিভাষায় ‘ব্যবহারিক মানুষ’ বলতে সাধারণত এমন কাউকেই বোঝায়, যিনি কেবল মানুষের বস্তুগত চাহিদাগুলোকেই অগ্রাধিকার দেন। তিনি বোঝেন যে শরীরের জন্য খাদ্যের প্রয়োজন আছে, কিন্তু মনের যে খোরাক দরকার, সে কথা তিনি বেমালুম ভুলে যান। ধরে নেওয়া যাক, বিশ্বের সব মানুষই সচ্ছল হলো, দারিদ্র্য আর ব্যাধিকে কমিয়ে একেবারে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হলো; তাহলেও একটি আদর্শ ও উন্নত সমাজ গড়ে তোলার জন্য অনেক কিছুই করা বাকি থেকে যাবে। এমনকি বর্তমান বিশ্বেও শরীরের চাহিদার চেয়ে মনের খোরাক কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আর দর্শনের প্রকৃত মূল্য নিহিত রয়েছে কেবল এই মানসিক ও বৌদ্ধিক কল্যাণের ভেতরেই। কেবল যারা মনের এই খোরাককে তুচ্ছ মনে করেন না, তাঁদেরকেই বোঝানো সম্ভব যে দর্শনচর্চা সময়ের অপচয় নয়।
অন্য যেকোনো বিদ্যাচর্চার মতো দর্শনেরও প্রাথমিক লক্ষ্য হলো জ্ঞান অর্জন করা। দর্শন মূলত এমন এক জ্ঞানের সন্ধান করে যা বিভিন্ন বিজ্ঞানকে একটি সুসংবদ্ধ ও সুনির্দিষ্ট কাঠামোয় বাঁধে। একই সাথে এটি আমাদের চিন্তাধারা, সংস্কার ও বিশ্বাসের ভিত্তিগুলোকে কঠোর বিচার-বিশ্লেষণের মুখোমুখি দাঁড় করায়। তবে দর্শন তার নিজস্ব প্রশ্নগুলোর খুব সুনির্দিষ্ট বা চূড়ান্ত উত্তর দিতে পেরেছে, এমন দাবি করার সুযোগ কম। আপনি যদি কোনো গণিতবিদ, খনিজবিদ কিংবা ইতিহাসবিদকে প্রশ্ন করেন যে তাঁর শাস্ত্র এ পর্যন্ত কী কী নিশ্চিত সত্য আবিষ্কার করতে পেরেছে, তবে আপনার ধৈর্য থাকা পর্যন্ত তিনি তার দীর্ঘ তালিকা দিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু একই প্রশ্ন যদি একজন সত্যনিষ্ঠ দার্শনিককে করেন, তবে তিনি অকপটে স্বীকার করবেন যে অন্যান্য বিজ্ঞানের মতো তাঁর শাস্ত্র স্থায়ী বা চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি।
অবশ্য এর পেছনে একটি বিশেষ কারণ রয়েছে। কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে যখনই সুনির্দিষ্ট ও নিশ্চিত জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব হয়ে ওঠে, তখন সেই বিষয়টি আর দর্শনের অন্তর্ভুক্ত থাকে না, বরং তা একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞানের শাখা হিসেবে রূপ নেয়।
মহাকাশ ও গ্রহ-নক্ষত্র বিষয়ক যাবতীয় আলোচনা একসময় দর্শনের অংশ ছিল, যা আজ জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। এমনকি আইজ্যাক নিউটনের বিখ্যাত গ্রন্থটির নামও ছিল The Mathematical Principles of Natural Philosophy। একইভাবে মানবমন সংক্রান্ত চর্চাও এককালে দর্শনের অংশ হলেও আজ তা মনস্তত্ত্ব বা মনোবিজ্ঞানের আলাদা একটি শাখা।
কাজেই দর্শনের এই অনিশ্চয়তা যতটা না বাস্তব, তার চেয়ে অনেক বেশি আপাতপ্রতীয়মান। যে প্রশ্নগুলোর সুনির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া সম্ভব হয়েছে, সেগুলোকে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় স্থান দেওয়া হয়েছে; আর যেসব প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর আজ অবধি মেলেনি, কেবল সেগুলোর অবশিষ্টাংশ নিয়েই টিকে রয়েছে আজকের দর্শন।
তবে দর্শনের এই অনিশ্চয়তার পেছনে এটিই একমাত্র সত্য নয়। এমন অনেক প্রশ্ন রয়েছে, যা আমাদের আত্মিক ও আধ্যাত্মিক চেতনার গভীরতম অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত। মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি যদি অলৌকিক কোনো রূপান্তরের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নতুন কোনো স্তরে উন্নীত না হয়, তবে আমাদের বর্তমান সীমাবদ্ধতা নিয়ে এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত সমাধান কোনোদিনই সম্ভব নয়।
এই মহাবিশ্বের পেছনে কি সত্যিই কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বা পরিকল্পনা আছে, নাকি এটি পরমাণুর আকস্মিক কিছু ঘটনার ফসল মাত্র?
মানুষের চেতনা কি তবে এই বিশ্বজগতেরই এক স্থায়ী সত্য, যা আমাদের জ্ঞানের সীমাকে অসীম পর্যন্ত ছড়িয়ে দেওয়ার আশা দেখায়?
নাকি এটি এক ক্ষুদ্র গ্রহে ঘটে যাওয়া ক্ষণস্থায়ী একটি দুর্ঘটনা মাত্র, যা শেষ পর্যন্ত প্রাণের বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে নিভে যাবে?
ভালো এবং মন্দের গুরুত্ব কি সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কাছেই রয়েছে, নাকি তা কেবল মানুষের সাথেই সীমাবদ্ধ?
দর্শন এসব মৌলিক প্রশ্নই উত্থাপন করে এবং বিভিন্ন দার্শনিক নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে এর বৈচিত্র্যময় উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে সত্য বলতে, কোনো উত্তর আবিষ্কার করা সম্ভব হোক বা না হোক, দর্শনের প্রস্তাবিত কোনো উত্তরই আজ পর্যন্ত যুক্তি দিয়ে চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করা যায়নি।
তবুও, এসব প্রশ্নের নিশ্চিত সমাধান পাওয়ার আশা যতই ক্ষীণ হোক না কেন, এ ধরনের প্রশ্ন নিয়ে নিরন্তর চিন্তা চালিয়ে যাওয়া দর্শনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। মানুষকে এই প্রশ্নগুলোর গুরুত্ব উপলব্ধি করানো, অনুমানের সমস্ত সম্ভাব্য পথ পরীক্ষা করা এবং বিশ্বজগৎ সম্পর্কে সেই অনুসন্ধিৎসু মনোভাবকে বাঁচিয়ে রাখা দর্শনের কাজ। নিশ্চিত ও প্রমাণিত জ্ঞানের গণ্ডিতে নিজেদের বন্দি করে রাখলে মানুষের ভেতরের এই সৃষ্টিশীল চিন্তাভাবনা সহজেই মরে যেতে পারে।
এ কথা সত্যি যে, অতীতে বহু দার্শনিক দাবি করেছেন দর্শন এসব মৌলিক প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর দিতে সক্ষম। ধর্মীয় বিশ্বাসের যা কিছু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তা কঠোর যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করা সম্ভব বলেই তাঁরা মনে করতেন। তবে এ জাতীয় প্রচেষ্টার যথার্থতা বিচার করতে হলে মানুষের জ্ঞানের পরিধি, তার অনুসৃত পদ্ধতি এবং সীমাবদ্ধতাগুলো নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে চূড়ান্ত বা আড়ষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া অনুচিত।
কাজেই, এসব জটিল প্রশ্নের কোনো সুনির্দিষ্ট বা নিশ্চিত উত্তরের ওপর দর্শনের প্রকৃত মূল্য নির্ভর করতে পারে না। অতএব, আবারও বলতে হয় যে, দর্শন পাঠের সার্থকতা এমন কোনো অর্জিত জ্ঞান বা নিশ্চিত তথ্যতালিকার মধ্যে নিহিত নয় যা কোনো শিক্ষার্থী মুখস্থ করে বা আয়ত্ত করে নেবে।
প্রকৃতপক্ষে দর্শনের মূল সার্থকতা নিহিত রয়েছে এর অনিশ্চয়তার ভেতরেই।
যে মানুষ কখনো দর্শন চর্চা করেনি, সে সারাজীবন নিজের অন্ধবিশ্বাস আর সমাজের চাপিয়ে দেওয়া ধ্যানধারণার খাঁচায় বন্দি থাকে। নিজের বিচার-বুদ্ধি খাটিয়ে কোনো কিছু পরখ করার ক্ষমতা তার থাকে না। এমন মানুষের কাছে জগৎটা বড় বেশি নির্দিষ্ট, সীমাবদ্ধ ও স্পষ্ট মনে হয়। অতি সাধারণ বিষয়গুলোও তার মনে কোনো প্রশ্নের জন্ম দেয় না, আর অচেনা যেকোনো সম্ভাবনাকে সে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে ছুড়ে ফেলে দেয়। কিন্তু আমরা যখনই দর্শন চর্চা করতে শুরু করি, তখন দেখতে পাই—অতি পরিচিত প্রাত্যহিক বিষয়গুলোর আড়ালেও এমন সব জটিল প্রশ্ন লুকিয়ে আছে, যার উত্তর পাওয়া সহজ নয়। দর্শন হয়তো তার তোলা প্রশ্নগুলোর নিশ্চিত কোনো সমাধান দিতে পারে না; কিন্তু তা আমাদের চিন্তার সামনে নতুন বহু সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। সমাজ ও কুসংস্কারের অন্ধ দাসত্ব থেকে আমাদের মুক্ত করে। সংক্ষেপে বললে, সত্য ঠিক কী—তা নিয়ে আমাদের অন্ধ অহংকার কিছুটা কমিয়ে দিলেও, সত্য আর কী কী হতে পারে—সে বিষয়ে আমাদের চিন্তাকে প্রসারিত করে। চিন্তার এই মুক্ত জগতে যারা কোনোদিন পা দেয়নি, দর্শন তাদের একগুঁয়ে মনোভাব ভেঙে দেয়; আর খুব চেনা জিনিসকেও নতুন আলোয় দেখিয়ে আমাদের মনের বিস্ময়বোধকে বাঁচিয়ে রাখে।
তবে না-ভাবা সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেওয়া ছাড়াও দর্শনের আরও একটি বড় মূল্য রয়েছে। আর সম্ভবত এটাই তার সবচেয়ে বড় সার্থকতা। তা হলো, যেসব বিষয় নিয়ে দর্শন ভাবায় সেগুলোর মহত্ত্ব, এবং এই ভাবনার মধ্য দিয়ে মানুষের সংকীর্ণ ও স্বার্থপর লক্ষ্য থেকে মুক্তি পাওয়া। কেবল প্রবৃত্তির ওপর ভর করে বাঁচা মানুষের জীবন নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের ছোট একটি গণ্ডির মধ্যেই আটকে থাকে। সেখানে পরিবার বা বন্ধুবান্ধব স্থান পেলেও বাইরের জগৎটাকে সে কেবল তখনই গোচরে আনে, যখন তা তার প্রবৃত্তিগত ইচ্ছা পূরণে সাহায্য করে কিংবা বাধা সৃষ্টি করে। এমন জীবনের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা ও বন্দিদশা কাজ করে, যার তুলনায় একজন দার্শনিকের জীবন অনেক বেশি শান্ত ও মুক্ত। শুধু নিজের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে বাঁচার এই ছোট জগৎটা আসলে খুবই ভঙ্গুর। তা দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল ও শক্তিশালী বিশ্বজগতের মাঝখানে, যা যেকোনো মুহূর্তে ধেয়ে এসে আমাদের এই ছোট সংসারকে তছনছ করে দিতে পারে।
আমরা যদি নিজেদের ভাবনার পরিধিকে বড় করে বাইরের পুরো বিশ্বটাকে তার মধ্যে জড়িয়ে নিতে না পারি, তবে অবরুদ্ধ দুর্গের একদল সৈন্যের মতোই আমাদের অবস্থা হবে—যারা জানে শত্রু তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে, পালিয়ে যাওয়ার পথ নেই এবং শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করতেই হবে। এমন জীবনে কোনো শান্তি থাকে না; সেখানে কেবল কামনা-বাসনার জেদ আর তা পূরণ করতে না পারার অক্ষমতার এক নিরন্তর দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। আমাদের জীবনকে যদি মহান ও মুক্ত করতে হয়, তবে যেকোনো উপায়েই হোক এই বন্দিশালা আর অনর্থক লড়াই থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতেই হবে।
এই বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে আসার একটি উপায় হলো দার্শনিক ভাবনার চর্চা। একজন দার্শনিক যখন দূরদৃষ্টি দিয়ে মহাবিশ্বকে দেখেন, তখন তিনি বিশ্বকে বন্ধু আর শত্রু, কল্যাণকর আর ক্ষতিকর কিংবা ভালো আর মন্দের মতো দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে ভাগ করেন না। তিনি পুরো বিশ্বকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিবেচনা করেন। খাঁটি দার্শনিক ভাবনার উদ্দেশ্য কখনোই এটা প্রমাণ করা নয় যে পুরো মহাবিশ্ব মানুষের পছন্দ-অপছন্দের মতোই চালিত হচ্ছে।
যেকোনো জ্ঞান অর্জনই আসলে মানুষের স্বীয় সত্তা বা আত্মাকে প্রসারিত করে। তবে এই প্রসার সবচেয়ে ভালোভাবে ঘটে তখনই, যখন আমরা জবরদস্তি করে তা পাওয়ার চেষ্টা করি না। যখন কেবল সত্য জানার ইচ্ছাটিই প্রধান হয়ে ওঠে, এবং আমরা বস্তুকে নিজের মনের মতো করে না দেখে বস্তু ঠিক যেমন—তেমনভাবেই তাকে গ্রহণ করতে শিখি, তখনই আমাদের আত্মার সত্যিকারের বিকাশ ঘটে। কিন্তু নিজের অহংকে আঁকড়ে ধরে রেখে আমরা যদি প্রমাণ করতে চাই যে বাইরের জগৎটাও হুবহু আমাদের চিন্তার মতোই, তবে সে বিকাশ আটকে যায়। এই ধরনের জোরজবরদস্তি হলো এক ধরনের অহংবোধ। আর যেকোনো অহংবোধই মানুষের আত্মার স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। দর্শনের চিন্তাতেও এই অহংবোধ বিশ্বজগৎকে নিজের উদ্দেশ্য সাধনের উপায় বলে মনে করে। ফলে তা জগৎকে নিজের চেয়ে ছোট করে ফেলে এবং নিজের উন্নতির পথ নিজেই বন্ধ করে দেয়। বিপরীতে, প্রকৃত ভাবনার ক্ষেত্রে আমরা শুরু করি আত্মাকে সরিয়ে রেখে, বাইরের অসীম বিশ্বকে কেন্দ্র করে। মহাবিশ্বের সেই বিশালতার মুখোমুখি হয়েই আমাদের মনের সীমানা অসীমতার ছোঁয়া পায়।
এই কারণেই যেসব দর্শন মহাবিশ্বকে কেবল মানুষের মাপে মেপে ব্যাখ্যা করতে চায়, তারা মানুষের আত্মাকে মহান করে তুলতে পারে না। জ্ঞান হলো নিজের সত্তা ও বাইরের জগতের এক অপূর্ব মিলন। যেকোনো মিলনের মতোই, এটিও নষ্ট হয়ে যায় যদি কোনো একপক্ষ আধিপত্য বিস্তার করতে চায় কিংবা বিশ্বজগৎকে জোর করে নিজের মনের মতো বানাতে যায়। দর্শনের জগতে এমন একটি জনপ্রিয় প্রবণতা রয়েছে যে—মানুষই সবকিছুর মাপকাঠি, সত্য হলো মানুষের তৈরি, আর স্থান, কাল কিংবা বিশ্বজগতের নিয়মগুলো সবই আসলে মানুষের মনেরই সৃষ্টি। মানুষের মন যা তৈরি করেনি, তা আমাদের কাছে অজ্ঞাত ও অর্থহীন।
আমাদের আগের আলোচনাগুলো যদি সঠিক হয়ে থাকে, তবে এই ধারণাটি ভুল। আর ভুল হওয়ার পাশাপাশি, এই চিন্তাটি দার্শনিক ভাবনার মূল মূল্যকেই ধ্বংস করে দেয়; কারণ তা মানুষকে নিজের সংকীর্ণ অহংয়ের ভেতরেই শিকল দিয়ে বেঁধে রাখে। একে জ্ঞান বলা চলে না। এটি মূলত কিছু কুসংস্কার, অভ্যাস ও অন্ধ বাসনার সমষ্টি, যা আমাদের এবং বাইরের বাস্তব জগতের মাঝে একটি অভেদ্য দেয়াল তুলে দেয়। যে মানুষ জ্ঞানের এই সংকীর্ণ তত্ত্বে আনন্দ পায়, সে মূলত সেই গৃহকোণপ্রধান মানুষের মতোই যে নিজের আধিপত্য হারানোর ভয়ে কখনো ঘরের বাইরে পা রাখতে চায় না।
বিপরীতে, খাঁটি দার্শনিক চিন্তার আনন্দ নিহিত রয়েছে নিজের ক্ষুদ্র ‘আমি’-কে ছাড়িয়ে বাইরের বিশ্বকে গ্রহণ করার মধ্যে। এই ভাবনা যে বস্তু নিয়ে চিন্তা করে, তাকে যেমন মহান করে তোলে, তেমনি যে মানুষ চিন্তা করছে তাকেও উন্নত করে। চিন্তার জগতে ব্যক্তিগত স্বার্থ, অভ্যাস কিংবা অন্ধ বাসনা সত্যকে বিকৃত করে; ফলে জ্ঞান ও জ্ঞানের বিষয়ের স্বাভাবিক মিলন বাধাগ্রস্ত হয়। এই ব্যক্তিগত চিন্তাগুলো জ্ঞাতা ও জ্ঞেয়ের মাঝে দেয়াল তুলে ধরে বুদ্ধিবৃত্তিকে এক বন্দিশালায় রূপ দেয়।
একখানি মুক্ত মন জগৎকে দেখে ঈশ্বরের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। যেখানে স্থান বা কালের কোনো সীমানা থাকে না, লাভ-ক্ষতির আশা বা ভয় থাকে না, এবং কোনো প্রথাগত সংস্কারের শেকল থাকে না। সেখানে থাকে কেবল নিরপেক্ষ এবং নিঃস্বার্থভাবে সত্যকে জানার আকুলতা। এটি মানুষের পক্ষে সম্ভব সবচেয়ে বস্তুনিষ্ঠ ও বিশুদ্ধতম জ্ঞান। তাই মুক্ত বুদ্ধি সেই বিমূর্ত ও সর্বজনীন জ্ঞানকে বেশি মূল্য দেয়, যার ভেতর কোনো মানুষের ব্যক্তিগত ইতিহাস এসে প্রভাব ফেলে না। সে পঞ্চইন্দ্রিয়লব্ধ ক্ষণস্থায়ী জ্ঞানের চেয়ে একেই বড় মনে করে, কারণ ইন্দ্রিয়জাত জ্ঞান সবসময় ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি আর আমাদের শারীরিক সীমাবদ্ধতার ওপর নির্ভর করে।
ভাবনার জগতে যে নিরপেক্ষতা হলো সত্যকে জানার খাঁটি আকুতি, কাজের ক্ষেত্রে সেটাই রূপ নেয় সঠিক ও ন্যায়বিচারে।
যে মন দার্শনিক চিন্তার স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, সে তার কর্ম ও অনুভূতির জগতেও সেই একই স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা ধরে রাখে। সে তার নিজের ইচ্ছা আর লক্ষ্যগুলোকে একটি অখণ্ড সত্যের ছোট অংশ হিসেবে দেখতে শেখে। সে বুঝতে পারে, এই বিশাল বিশ্বে তার একার কর্মকাণ্ড পুরো বিশ্বকে বদলে দেয় না; ফলে নিজের মতামত চাপিয়ে দেওয়ার সেই উগ্রতা তার থাকে না। আর অনুভূতির জগতে তা হয়ে ওঠে এক সর্বজনীন ভালোবাসা, যা কেবল চেনা বা কাছের মানুষের মধ্যেই আটকে থাকে না, বরং ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে।
এভাবেই দার্শনিক ভাবনা কেবল আমাদের চিন্তার সীমানাই বাড়ায় না, বরং আমাদের কর্ম ও অনুভূতির জগৎকেও বিশাল করে তোলে। তা আমাদের কোনো সংকীর্ণ দেয়ালঘেরা শহরের ক্ষুদ্র বাসিন্দা না বানিয়ে, এই সমগ্র বিশ্বজগতের নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। আর মহাবিশ্বের এই বিশ্বনাগরিকত্বের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানুষের সত্যিকারের স্বাধীনতা এবং সংকীর্ণ আশা-আকাঙ্ক্ষার দাসত্ব থেকে চিরমুক্তি।
দর্শনের প্রশ্নগুলোর কোনো নিশ্চিত বা অকাট্য উত্তর পাওয়া যায় না, তাই নির্দিষ্ট কোনো উত্তর পাওয়ার আশায় দর্শন পড়া উচিত নয়। বরং দর্শন পড়া উচিত সেই প্রশ্নগুলোর স্বার্থেই। কারণ এই প্রশ্নগুলো আমাদের সম্ভাবনার দিগন্তকে প্রসারিত করে, আমাদের ভাবনার জগৎকে সমৃদ্ধ করে এবং আমাদের মনের দরজা বন্ধ করে দেওয়া একগুঁয়ে অন্ধ বিশ্বাসকে দূর করে।
তবে সবকিছুর ওপরে, দর্শন যে মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করে তার বিশালতার কারণেই মানুষের মনটাও মহান হয়ে ওঠে, এবং বিশ্বজগতের সাথে একাত্ম হওয়ার সেই পরম সামর্থ্য অর্জন করে। এটাই মানুষের অস্তিত্বের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি।
মূল রচনা: The Problems of Philosophy (১৯১২), অধ্যায় ১৫ — The Value of Philosophy।







Comments