Skip to content

ঐতিহ্য কীভাবে নির্মিত হয়

অনুবাদক-ভূমিকা

আমরা সাধারণত ‘ঐতিহ্য’ বলতে এমন কিছু বুঝি, যা সুদীর্ঘকাল ধরে সমাজে প্রচলিত, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে উত্তরাধিকারসূত্রে বহমান এবং অতীতের সঙ্গে বর্তমানের একটি স্বাভাবিক যোগসূত্র রচনা করে। কিন্তু ইতিহাস কি সত্যিই এতটা সরল? যে ঐতিহ্যকে আমরা প্রাচীন বলে বিশ্বাস করি, তার সবকিছুই কি সত্যিই অতীতের উত্তরাধিকার? নাকি এর কিছু অংশ আধুনিক রাষ্ট্র, জাতীয়তাবাদ কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রয়োজনে সচেতনভাবে নির্মিত?

এই প্রশ্নগুলোরই অনুসন্ধান করেছেন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ এরিক হবসবম। তাঁর সম্পাদিত The Invention of Tradition গ্রন্থটি আধুনিক ইতিহাসচর্চা ও জাতীয়তাবাদ-অধ্যয়নের অন্যতম ক্লাসিক রচনা হিসেবে বিবেচিত। বইটির প্রথম অধ্যায়ে হবসবম ‘Invented Tradition’ বা ‘উদ্ভাবিত ঐতিহ্য’ ধারণার তাত্ত্বিক ভিত্তি ব্যাখ্যা করেন এবং দেখান, বহু প্রচলিত আচার, প্রতীক ও রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্য আসলে আধুনিক যুগের সৃষ্টি—যেগুলোকে অতীতের ধারাবাহিকতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে সামাজিক সংহতি, রাজনৈতিক বৈধতা কিংবা জাতীয় পরিচয় নির্মাণের উদ্দেশ্যে।

এখানে প্রকাশিত অনুবাদটি The Invention of Tradition গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ের বাংলা রূপ। ইতিহাস, জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্র এবং ঐতিহ্যের সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে এটি একটি মৌলিক পাঠ। আশা করা যায়, পাঠক এই অনুবাদের মাধ্যমে হবসবমের আলোচিত ধারণাটিকে তার মূল বৌদ্ধিক প্রেক্ষাপটে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন।

ব্রিটিশ রাজপরিবারের নানা অনুষ্ঠান ও রীতিনীতি দেখে মনে হয় এগুলো যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছে। বাস্তবে এত প্রাচীন জিনিস খুঁজে পাওয়া কঠিন। এর বর্তমান রূপটি মূলত উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ ও বিংশ শতাব্দীতে গড়ে উঠেছে। যেসব ঐতিহ্য নিজেদের প্রাচীন বলে দাবি করে বা যেগুলোকে পুরোনো বলে মনে হয়, সেগুলোর ইতিহাস প্রায়শই বেশ সাম্প্রতিক। ক্ষেত্রবিশেষে এগুলো সম্পূর্ণ নতুন করে তৈরি বা উদ্ভাবন করা হয়েছে।

প্রাচীন ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কলেজ-সংস্কৃতি ও আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে, তারা স্থানীয় পর্যায়ে এমন অনেক ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠার কথা মনে করতে পারবেন। তবে এর মধ্যে কিছু অনুষ্ঠান কিন্তু রেডিওর মতো আধুনিক গণমাধ্যমের কারণে দেশজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। যেমন— বড়দিনের আগের রাতে কেমব্রিজের কিংস কলেজ চ্যাপেলে অনুষ্ঠিত বার্ষিক ‘ফেস্টিভ্যাল অব নাইন লেসনস অ্যান্ড ক্যারোলস’। মূলত এই পর্যবেক্ষণ থেকেই ঐতিহাসিক পত্রিকা ‘পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট’ একটি সেমিনারের আয়োজন করেছিল।

‘নির্মিত ঐতিহ্য’ (invented tradition) ধারণাটি বেশ বড় পরিসরে ব্যবহৃত হলেও এর অর্থ অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট।

এর ভেতরে দুই ধরনের প্রথাকে অন্তর্ভুক্ত করা যায়: এক, যেগুলো সরাসরি পরিকল্পনা করে ও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যেমন—১৯৩২ সালে ব্রিটেনে রাজপরিবারের বার্ষিক ক্রিসমাস বার্তা চালু হওয়া। দুই, যেগুলো কোনো নির্দিষ্ট তারিখ ছাড়া অল্প সময়ের মধ্যে অতি দ্রুত সমাজে গড়ে উঠেছে। যেমন—ফুটবলের ‘কাপ ফাইনাল’কে ঘিরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন রীতিনীতি। এই দ্বিতীয় ধরনের প্রথাগুলোর সূচনার ইতিহাস নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা কঠিন।

এই সব প্রথা যে সমানভাবে চিরস্থায়ী হবে, তা নয়। তবে এগুলো কত দিন টিকে থাকবে, তার চেয়েও আমাদের মূল বিচার্য বিষয় হলো—এগুলোর সূচনা ও প্রতিষ্ঠা পাওয়ার প্রক্রিয়াটি।

মূলত ‘নির্মিত ঐতিহ্য’ বলতে বোঝায় কিছু প্রথার সমষ্টি, যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মেনে নেওয়া কিছু নিয়ম এবং প্রতীকী আচারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে এগুলো নির্দিষ্ট কিছু মূল্যবোধ ও আচরণের মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করে যা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই অতীতের সাথে একটি ধারাবাহিকতার অনুভুতি তৈরি করে। বস্তুত, যেখানেই সুযোগ থাকে, এগুলো নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী একটি উপযুক্ত ঐতিহাসিক অতীতের সঙ্গে সেই ধারাবাহিকতা প্রমাণের চেষ্টা করে।

এর একটি জলজ্যান্ত উদাহরণ হলো উনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ভবন পুনর্নির্মাণের সময় ইচ্ছা করেই ‘গথিক স্থাপত্যশৈলী’ বেছে নেওয়া। কিংবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পার্লামেন্টের কক্ষটিকে ঠিক আগের নকশাতেই পুনরায় গড়ে তোলার সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত।

তবে এই নতুন ঐতিহ্যকে যে ইতিহাসের সাথে যুক্ত করা হচ্ছে, তা যে বহু প্রাচীন বা কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া কোনো সময় হতে হবে এমন নয়। এমনকি যেসব বিপ্লব বা ‘প্রগতিশীল আন্দোলন’ অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে, সংজ্ঞানুসারেই তাদেরও নিজস্ব প্রাসঙ্গিক ইতিহাস থাকে। যদিও সেই ইতিহাসের শুরু হয়তো ১৭৮৯ সালের মতো নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ সময় থেকে।

এই অর্থে ‘ঐতিহ্য’ (tradition)-কে তথাকথিত ‘ঐতিহ্যবাহী’ সমাজে প্রচলিত ‘প্রথা’ (custom) থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা করতে হবে। বানানো ঐতিহ্যসহ সব ধরনের ‘ঐতিহ্যে’র মূল বৈশিষ্ট্য হলো এর অপরিবর্তনীয়তা। অতীত তা সত্য হোক বা কাল্পনিক, যে অতীতকে এরা মূল রেফারেন্স হিসেবে ধরে নেয়, তা কিছু নির্দিষ্ট অনুশীলনের ওপর বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেয়; যেমন একই আচারের বারবার পুনরাবৃত্তি।

অন্যদিকে, ঐতিহ্যবাহী সমাজগুলোতে ‘প্রথা’ মূলত চালিকাশক্তি ও গতি-নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে। প্রথা কিন্তু নির্দিষ্ট একটি সীমা পর্যন্ত নতুন কোনো উদ্ভাবন বা পরিবর্তনকে আটকে রাখে না। যদিও এটি আগের কোনো উদাহরণের সাথে মিলিয়ে নিতে হয় বলে এর সুযোগ কিছুটা সীমিত থাকে। প্রথা মূলত যা করে তা হলো যেকোনো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনকে (কিংবা নতুনত্ব ঠেকানোর চেষ্টাকে) আগের নজির, সামাজিক ধারাবাহিকতা এবং ইতিহাসের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

কৃষক আন্দোলনের গবেষকরা জানেন যে, কোনো গ্রামের ‘অনাদিকাল ধরে প্রথার মাধ্যমে’ কোনো সাধারণ জমি বা অধিকারের ওপর দাবি তোলাটা প্রায়শই কোনো ঐতিহাসিক তথ্য নয়। বরং তা জমিদার কিংবা প্রতিবেশী গ্রামের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ে টিকে থাকা ক্ষমতার ভারসাম্যকে প্রকাশ করে। একইভাবে, ব্রিটিশ শ্রমিক আন্দোলনের গবেষকরাও জানেন যে, কাজের জায়গা বা কারখানার ‘প্রথা’ বলতে সবসময় কোনো প্রাচীন ঐতিহ্যকে বোঝায় না। বরং অতি সম্প্রতি হলেও শ্রমিকরা চর্চার মাধ্যমে যেসব অধিকার আদায় করে নিয়েছে এবং স্থায়ী করার দোহাই দিয়ে এখন যা রক্ষা বা বাড়াতে চায়, সেটাই হলো তাদের প্রথা।

‘প্রথা’ কখনো একদম অপরিবর্তনীয় হতে পারে না। কারণ এমনকি তথাকথিত ‘ঐতিহ্যবাহী’ সমাজেও মানুষের জীবনযাপন কখনো এক জায়গায় থেমে থাকে না। প্রথাগত আইন-এর দিকে তাকালে এখনো দেখা যায়, এর ভেতরে থাকে বদলানোর নমনীয়তা, আর বাইরে থাকে পুরোনো নিয়ম মেনে চলার একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। আমাদের আলোচিত ‘ঐতিহ্য’ এবং ‘প্রথা’র মধ্যকার আসল পার্থক্যটি এখানেই সবচেয়ে সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে।

আমাদের আলোচনার ‘ঐতিহ্য’ (tradition)-এর সাথে সাধারণ ‘প্রথা’ বা ‘নিয়মমাফিক চর্চা’ (convention or routine)-র একটি দ্বিতীয় পার্থক্য টেনে নেওয়া দরকার। যদিও এটি আগের পার্থক্যের মতো অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রথা বা নিয়মিত অভ্যাসের পেছনে কোনো প্রতীকী গুরুত্ব থাকে না। তবে দুর্ঘটনাবশত বা কাকতালীয়ভাবে কখনো কখনো এর সাথে তা যুক্ত হয়ে যেতে পারে।

এটা স্পষ্ট যে, যেসব সামাজিক কাজ বারবার করতে হয়, কাজের সুবিধা ও দক্ষতার খাতিরে সেগুলোতে এক ধরনের নির্দিষ্ট নিয়ম বা রুটিন তৈরি হয়ে যায়। নতুন কাউকে সেই কাজ শেখানোর সুবিধার্থে এসব নিয়ম লিখিত বা অলিখিতভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপও পায়। এটি যেমন উড়োজাহাজ চালকের কাজের মতো একেবারে নতুন পেশার ক্ষেত্রে সত্যি, তেমনি বহু পুরোনো কোনো পরিচিত কাজের ক্ষেত্রেও একইভাবে সত্যি।

শিল্প বিপ্লবের পর থেকে সমাজগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় এই ধরনের নতুন নতুন নিয়ম বা রুটিন তৈরি করতে বাধ্য হয়েছে। এসব রুটিন সবচেয়ে ভালো কাজ করে তখন, যখন তা মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয় কিংবা অবচেতন মনের স্বয়ংক্রিয় কাজের মতো হয়ে যায়। আর এর জন্য দরকার পড়ে কাজের একদম নিখুঁত অপরিবর্তনীয়তা।

তবে এই অপরিবর্তনীয় নিয়ম আবার কাজের অন্য একটি দরকারি জায়গায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তা হলো, হঠাৎ কোনো অপ্রত্যাশিত বা অচেনা সমস্যা সামনে আসলে তা সামলানোর ক্ষমতা কমে যাওয়া। কাজের এই অতিরিক্ত নিয়মকানুনে বাঁধা পড়া বা আমলাতন্ত্রের এটি একটি বড় দুর্বলতা। বিশেষ করে নিম্ন বা মাঠ পর্যায়ে, যেখানে কোনো হেরফের ছাড়া নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে কাজ করাটাকেই দক্ষতা বলে মনে করা হয়।

নিয়ম ও রুটিনের এই নেটওয়ার্কগুলোকে ‘নির্মিত ঐতিহ্য’ বলা যায় না। কারণ এদের কাজ এবং যৌক্তিকতা হলো কারিগরি, কোনো আদর্শিক নয়। মার্কসীয় পরিভাষায় বলতে গেলে এগুলো ‘সুপারস্ট্রাকচার’ বা উপরি কাঠামোর অংশ নয়, বরং ‘বেস’ বা মূল কাঠামোর অংশ। এগুলো তৈরি করা হয় সুনির্দিষ্ট কিছু বাস্তব কাজ সহজ করার জন্য। বদলানো বাস্তব চাহিদার সাথে তাল মেলাতে এগুলো সহজেই পরিবর্তন করা যায়, এমনকি ছুড়েও ফেলা যায়। তবে যেকোনো দীর্ঘদিনের অনুশীলনের সাথে যে এক ধরনের স্থবিরতা চলে আসে এবং এর সাথে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া মানুষের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ তৈরি হয়, সেটাকেও এখানে মাথায় রাখা হয়।

খেলাধুলার স্বীকৃত নিয়মকানুন, সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন ধরন বা বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা অন্যান্য নিয়মের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কিন্তু যখন এই বাস্তব নিয়মগুলোর সাথে ‘ঐতিহ্য’ এসে মিশে যায়, তখন দুটোর পার্থক্য খুব স্পষ্ট বোঝা যায়।

যেমন, ঘোড়া চড়ার সময় শক্ত হ্যাট পরা একটা বাস্তব কাজের কথা, ঠিক যেমন মোটরসাইকেল আরোহীর হেলমেট বা সৈন্যের স্টিল হেলমেট পরা। কিন্তু শিকারিদের ঐতিহ্যবাহী গোলাপি পোশাকের সাথে একটি বিশেষ ধরনের শক্ত হ্যাট পরার বিষয়টিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের অর্থ তৈরি হয়। তা যদি না হতো, তবে সেনাবাহিনীগুলোর মতো রক্ষণশীল প্রতিষ্ঠানেও বেশি সুরক্ষা পাওয়ার যুক্তিতে যেমন সহজেই হেলমেটের আকার বদলে ফেলা যায়, শিকারিদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক বদলানোও ঠিক ততটাই সহজ হতো।

প্রকৃতপক্ষে, ‘ঐতিহ্য’ এবং বাস্তবসম্মত ‘নিয়ম বা রুটিন’-এর সম্পর্কটি হলো বিপরীতমুখী। ঐতিহ্য তখন তার শক্তি হারায়, যখন এর পেছনে কোনো বাস্তব যুক্তি দাঁড় করানো হয়। যেমন উদারপন্থী ইহুদিরা তাদের প্রাচীন ধর্মীয় খাদ্যাভ্যাসের নিষেধাজ্ঞাকে স্বাস্থ্য সুরক্ষার অজুহাতে সঠিক প্রমাণের চেষ্টা করে এবং যুক্তি দেয় যে প্রাচীন হিব্রু জাতি স্বাস্থ্যবিধির কারণেই শুয়োরের মাংস নিষিদ্ধ করেছিল।

অন্যদিকে, কোনো বস্তু বা প্রথা যখন নিজের বাস্তব কার্যকারিতার বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়, তখনই তা পুরোপুরি প্রতীকী ও আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। যেমন, অশ্বারোহী বাহিনীর অফিসারদের ইউনিফর্মে থাকা বুটের কাঁটা ঐতিহ্যের জন্য তখনই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন চড়ার জন্য কোনো ঘোড়াই আর থাকে না। সাধারণ পোশাকে গার্ডস অফিসারদের ছাতাটি শক্ত করে গুটিয়ে না রাখলে (অর্থাৎ ছাতা হিসেবে অকেজো না বানিয়ে রাখলে) তা তার তাৎপর্য হারায়। ঠিক একইভাবে, সাধারণ মানুষ পরচুলো বা উইগ পরা বন্ধ না করা পর্যন্ত উকিলদের মাথায় পরা এই উইগ আজকের মতো এমন আনুষ্ঠানিক তাৎপর্য লাভ করতে পারত না।

এখানে ধরে নেওয়া হচ্ছে যে, ‘ঐতিহ্য বানিয়ে তোলা’ বিষয়টির মূল কাজই হলো কিছু প্রথা ও নিয়মকানুনকে বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং সেগুলোকে অতীতের সঙ্গে যুক্ত করা। তবে এই ধরনের আচার ও প্রতীকী ব্যবস্থার জটিল গঠনটি ঠিক কীভাবে তৈরি হয়, তা নিয়ে ইতিহাসবিদরা এখনো পর্যাপ্ত গবেষণা করেননি। এই পুরো প্রক্রিয়াটির সিংহভাগই এখনো বেশ অন্ধকার ও ধোঁয়াটে রয়ে গেছে।

কোনো ‘ঐতিহ্য’ যখন একজন একক ব্যক্তি নিজে উদ্যোগ নিয়ে তৈরি ও প্রতিষ্ঠা করেন, তখন বিষয়টি সম্ভবত সবচেয়ে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। যেমন লর্ড ব্যাডেন-পাওয়েল একাই ‘বয় স্কাউট’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আবার সরকার বা রাষ্ট্র যখন আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পরিকল্পিত উৎসবের আয়োজন করে, তখনও বিষয়টিকে সহজে চিহ্নিত করা যায়। কারণ এদের লিখিত দলিল বা রেকর্ড চমৎকারভাবে সংরক্ষণ করা থাকে। নাৎসিদের তৈরি বিভিন্ন প্রতীক কিংবা নিউরেমবার্গের দলীয় সমাবেশগুলো এর সেরা উদাহরণ।

তবে সমস্যা বাঁধে অন্য জায়গায়। যখন কোনো ঐতিহ্য কোনো ব্যক্তিবর্গ বা অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠী নিজেদের ভেতরে আংশিক তৈরি ও আংশিক বিবর্তিত করে তোলে, তখন তার হিসাব রাখা সবচেয়ে কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ এসব ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিকভাবে কোনো লিখিত রেকর্ড রাখা হয় না। যেমনটি দেখা যায় পার্লামেন্ট বা আইন পেশার ভেতরের অনানুষ্ঠানিক রীতিনীতির ক্ষেত্রে। এখানে সমস্যাটি শুধু তথ্যের উৎসের অভাব নয়, বরং পদ্ধতিগতও। প্রতীক ও আচার গবেষণার জন্য ‘হেরাল্ড্রি’ কিংবা ‘লিটার্জি’-র মতো কিছু বিশেষ শাস্ত্র রয়েছে। এমনকি ওয়ারবার্গ ঘরানার কিছু ঐতিহাসিক গবেষণাপদ্ধতিও আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, শিল্প বিপ্লব পরবর্তী সময়ের ইতিহাসবিদরা এই পদ্ধতিগুলোর সাথে খুব একটা পরিচিত নন।

ইতিহাসবিদরা পৃথিবীর যে সময় বা যে অঞ্চল নিয়েই কাজ করুন না কেন, এমন কোনো দেশ বা যুগ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যেখানে এই অর্থে ‘ঐতিহ্য বানিয়ে তোলা’র ঘটনা ঘটেনি। তবে সমাজে যখন দ্রুত পরিবর্তন আসে, তখন পুরোনো ঐতিহ্যগুলোর ভিত্তিমূল দুর্বল হয়ে পড়ে বা ধ্বংস হয়ে যায়। যে সামাজিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে ওই পুরোনো ঐতিহ্যগুলো তৈরি হয়েছিল, তা যখন আর থাকে না কিংবা নতুন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হয়, তখনই ঐতিহ্য বানানোর এই প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে যায়।

যেসব প্রতিষ্ঠান ওই পুরোনো ঐতিহ্যগুলোকে টিকিয়ে রাখত বা প্রচার করত, সেগুলো যখন নিজেদের আর নমনীয় বা বদলানোর উপযোগী করে তুলতে পারে না, তখন সেগুলো সমাজ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। সংক্ষেপে বলতে গেলে, সমাজে যখন চাহিদা বা জোগানের দিক থেকে খুব বড় এবং দ্রুত পরিবর্তন আসে, তখনই নতুন ঐতিহ্য তৈরি হয়। গত ২০০ বছরে এই ধরনের পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। তাই এই পুরো সময়জুড়ে মুহূর্তের মধ্যে নতুন নতুন ঐতিহ্যের জন্ম হতে দেখা গেছে।

এর মাধ্যমে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়, যা ১৯ শতকের উদারনীতিবাদ এবং সাম্প্রতিক সময়ের ‘আধুনিকায়ন তত্ত্ব’ উভয় ধারণারই বিপরীত। তা হলো, এই ধরনের অনুষ্ঠানকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চর্চা শুধু তথাকথিত ‘ঐতিহ্যবাহী’ বা প্রাচীন সমাজেই ঘটে না, বরং আধুনিক সমাজগুলোতেও নিজস্ব রূপে এর বড় স্থান রয়েছে।

তবে সাধারণভাবে কথাটা সত্যি হলেও দুটি বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। প্রথমত, প্রাচীন সমাজের গঠন ও তার সাথে জড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যগুলো কখনোই খাপ খাওয়াতে পারত না এবং দ্রুত অকেজো হয়ে যেত—এমনটা ভাবা ভুল। দ্বিতীয়ত, কেবল পুরোনো ঐতিহ্য ব্যবহারে অক্ষমতার কারণেই যে নতুন ঐতিহ্য তৈরি হতো বিষয়টি তাও নয়।

বাস্তবে দেখা যায়, নতুন পরিস্থিতিতে পুরোনো জিনিসকেই খাপ খাইয়ে নেওয়া হতো কিংবা নতুন উদ্দেশ্যে পুরোনো মডেলকেই ব্যবহার করা হতো। পুরোনো যেসব প্রতিষ্ঠানের কাজ, ইতিহাস এবং আচার-অনুষ্ঠানের ভাষা আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল, সেগুলোকে এভাবে বদলে নেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।

যেমন, ক্যাথলিক চার্চকে নতুন রাজনৈতিক ও ভাবাদর্শিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছিল, একই সাথে ধর্মবিশ্বাসীদের গঠনেও বড় পরিবর্তন আসছিল (যেমন সাধারণ ভক্ত ও পাদ্রি উভয়ের মাঝেই নারীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি)। পেশাদার সেনাবাহিনীগুলোকে হঠাৎ বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার (কনস্ক্রিপশন) মুখোমুখি হতে হয়েছিল। আদালত বা বিচারালয়ের মতো প্রাচীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বদলে যাওয়া প্রেক্ষাপটে কাজ করতে হচ্ছিল। কখনো কখনো নতুন পরিস্থিতিতে তাদের কাজের ধরনও বদলে যাচ্ছিল।

একইভাবে এমন কিছু প্রতিষ্ঠানও ছিল, যেগুলো নামে বা কাগজে-কলমে আগের মতোই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিল, কিন্তু বাস্তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো কিছুতে রূপ নিয়েছিল। এর সেরা উদাহরণ হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

যেমন, ইতিহাসবিদ বানসন ১৮৪৮ সালের পর জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের গণহারে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রাচীন রীতিটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করেছেন। অতীতে কোনো সংঘাত হলে বা প্রতিবাদের উদ্দেশ্যে শিক্ষার্থীরা এভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যেত। কিন্তু পরবর্তীতে এটি বন্ধ হওয়ার পেছনে কাজ করেছিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক চরিত্র বদলে যাওয়া, শিক্ষার্থীদের গড় বয়স বেড়ে যাওয়া, এবং তাদের মধ্যবিত্ত হয়ে ওঠা (যার ফলে শহর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বন্দ্ব এবং শিক্ষার্থীদের দাঙ্গাহাঙ্গামা কমে এসেছিল)। এর পাশাপাশি এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সহজে স্থানান্তরের নতুন নিয়ম, শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলোর গঠন পরিবর্তনসহ আরও নানা কারণ এর পেছনে ছিল।

এই সবক্ষেত্রেই দেখা যায়, কোনো নতুন বিষয় যদি নিজেকে প্রাচীন সাজে সুন্দরভাবে সাজিয়েও নেয়, তবুও তা নতুনই থাকে; তার নতুনত্ব কোনোভাবেই কমে যায় না।

আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে আরও বেশি আগ্রহের বিষয় হলো সম্পূর্ণ নতুন উদ্দেশ্যে নতুন ধরনের ‘নির্মিত ঐতিহ্য’ গড়ে তুলতে প্রাচীন নানা উপাদান বা উপকরণের ব্যবহার। যেকোনো সমাজের অতীত ইতিহাসেই এই ধরনের উপকরণের এক বিশাল ভাণ্ডার জমে থাকে। আর প্রতীকী চর্চা বা যোগাযোগের একটি বেশ সুসংগঠিত ভাষাও সব সময়ই হাতের কাছে পাওয়া যায়।

কখনো কখনো এসব নতুন ঐতিহ্যকে খুব সহজেই পুরোনো ঐতিহ্যগুলোর সাথে জুড়ে দেওয়া যেত। আবার কখনো সরকারি আচার-অনুষ্ঠান, প্রতীক, ধর্মীয় মূল্যবোধের উপদেশ, রাজকীয় জাকজমক, লোকগাথা কিংবা ফ্রিম্যাসনরি (যা নিজেও পরবর্তীতে এক বিশাল প্রতীকী শক্তি হয়ে ওঠা একটি নির্মিত ঐতিহ্য) এসবের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার থেকে উপাদান ধার করে নতুন প্রথা বানিয়ে নেওয়া হতো।

উনবিংশ শতাব্দীতে আধুনিক যুক্তরাষ্ট্র গঠনের সাথে সাথে সুইজারল্যান্ডের জাতীয়তাবাদের যে বিকাশ ঘটেছিল, ইতিহাসবিদ রুডলফ ব্রাউন তার গবেষণায় বিষয়টি দারুণভাবে তুলে ধরেছেন। এর পেছনে তার দুটি বড় সুবিধা ছিল। প্রথমত, তিনি ‘ফোকলোর’ (Volkskunde) বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন, যা এই ধরনের গবেষণার জন্য একদম উপযুক্ত। দ্বিতীয়ত, সুইজারল্যান্ড এমন একটি দেশ যেখানে নাৎসিদের অপব্যবহারের সাথে কোনো যোগাযোগ না থাকায় এই বিষয়গুলোর আধুনিকায়ন থমকে যায়নি।

সেখানে বিদ্যমান নানা লোকজ প্রথা, যেমন লোকসংগীত, শারীরিক কসরত বা খেলাধুলা এবং লক্ষ্যভেদের প্রতিযোগিতা (নিশানা বাজি)—এগুলোকে নতুন জাতীয় উদ্দেশ্যে কিছুটা বদলে নেওয়া হয়, প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয় এবং প্রথায় পরিণত করা হয়।

পুরোনো প্রথাগত লোকসংগীতগুলোর পাশাপাশি একই সুর ও ঢঙে নতুন নতুন গান যুক্ত করা হয়। এসব গান প্রায়ই স্কুলের শিক্ষকরা রচনা করতেন এবং এগুলোকে দলীয় সংগীতে রূপ দেওয়া হতো। গানগুলোর মূল সুর ছিল দেশপ্রেমমূলক ও প্রগতিশীল (যেমন, ‘জাতি, ওহে জাতি, কতই না মধুর এই নাম’)। তবে একই সাথে ধর্মীয় স্তোত্রের মতো প্রভাব বিস্তারকারী শক্তিশালী নানা উপাদানও এতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল। (বিশেষ করে স্কুলের জন্য এই ধরনের নতুন নতুন গানের সংকলন কীভাবে তৈরি হয়েছিল, তা সত্যি আলাদা গবেষণার দাবি রাখে।)

সুইজারল্যান্ডের ‘ফেডারেল সং ফেস্টিভ্যাল’-এর নিয়মকানুনগুলোতে ঘোষণা করা হয়েছিল যে, এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের গান গাওয়ার চর্চার বিকাশ ও উন্নতি ঘটানো। সেই সাথে ঈশ্বর, স্বাধীনতা, দেশ, শিল্প অনুরাগী বন্ধুদের ঐক্য এবং জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের উচ্চমার্গীয় অনুভূতিগুলোকে জাগ্রত করা। (এখানে ‘উন্নতি’ বা ‘Improvement’ শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমেই উনবিংশ শতাব্দীর প্রগতির সেই বিশেষ সুরটি ফুটে ওঠে।)

এই সব উৎসবের উৎসবকে ঘিরেই এক বিশাল অনুষ্ঠানের নিয়মকানুন চালু হয়ে যায়। যেমন প্যান্ডেল বা মণ্ডপ তৈরি, পতাকা টাঙানোর ফ্রেম বানানো, ধর্মীয় মানত করার জায়গা তৈরি, বর্ণাঢ্য মিছিল, ঘণ্টা বাজানো, তোপধ্বনি দেওয়া, সরকারি মেহমানদের আসা, নৈশভোজ এবং বড় বড় ভাষণ দেওয়া। এই নতুন আয়োজনেও আসলে পুরোনো দিনের জিনিসগুলোকেই নতুনভাবে সাজিয়ে ব্যবহার করা হয়েছিল।

পুরোনো আমলের রাজকীয় জাকজমকপূর্ণ উদযাপনের ছাপ এই নতুন উৎসবগুলোতে স্পষ্ট দেখা যেত। পুরোনো দিনে যেমন রাজা আর ধর্ম এক হয়ে উৎসব করত, ঠিক তেমনি এখানেও গান গাওয়া, খেলাধুলা ও রাইফেল প্রতিযোগিতার ভেতরে ধর্ম এবং দেশপ্রেমকে একসাথে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

তবে নতুন ঐতিহ্য তৈরি করার সময় মানুষ ঠিক কতটা পুরোনো জিনিস ব্যবহার করতে পারে, আর কতটা নতুন নিয়ম বানাতে বাধ্য হয়, সেই হিসাব করা বেশ কঠিন।

তবে এটুকু স্পষ্ট যে, অনেক নতুন নতুন দল ও দেশপ্রেমের আন্দোলন একেবারেই নতুন ছিল। তাই তাদের কোনো পুরোনো ইতিহাস ছিল না। বাধ্য হয়ে তারা এক ধরনের বানিয়ে নেওয়া কাল্পনিক ইতিহাস বা নকল পুরোনো খাতা-পত্র তৈরি করে দাবি করতে লাগল যে, তাদের ইতিহাস অনেক পুরোনো।

একই সাথে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সময় বেশ কিছু নতুন প্রতীকের জন্ম হয়। যেমন জাতীয় সংগীত (১৭৪০ সালে ব্রিটিশদের বানানো জাতীয় সংগীতকে সবচেয়ে পুরোনো মনে করা হয়), জাতীয় পতাকা (ফরাসি বিপ্লবের লাল-সাদা-নীল পতাকার দেখাদেখি যা তৈরি হয়েছিল), আর দেশকে মানুষের রূপ দেওয়া। যেমন ছবির মাধ্যমে দেশকে কোনো একজন মানুষের মতো করে আঁকা হতো। কোথাও সেটা দেশের সরকারি প্রতীক হিসেবে (যেমন ফ্রান্সের ‘ম্যারিয়ান’ বা জার্মানির ‘জার্মানিয়া’), আবার কোথাও ব্যঙ্গচিত্র বা কার্টুনের মাধ্যমে (যেমন ব্রিটিশদের ‘জন বুল’ কিংবা আমেরিকানদের ‘আঙ্কেল সাম’)।

এমনকি পুরোনো দিনের জিনিসগুলোর ক্ষেত্রেও যে মাঝে মাঝে এক যুগের সাথে পরের যুগের ছন্দপতন বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত, সে কথা ভুলে গেলে চলবে না।

যেমন, গবেষক লয়েড দেখিয়েছেন যে সপ্তদশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের গ্রামভিত্তিক বড়দিনের পুরোনো গানগুলো তৈরি হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। সেগুলোর জায়গায় স্থান করে নেয় চার্চের ধর্মীয় বইয়ের গান। অবশ্য মেথডিস্টদের মতো গ্রাম কেন্দ্রিক ধার্মিকদের হাত ধরে এসব গানে কিছুটা লোকজ বা সাধারণ মানুষের ছোঁয়াও এসেছিল।

পরবর্তীতে মধ্যবিত্ত সংগ্রাহকরা এই গানগুলোকে নতুন করে আবার বাঁচিয়ে তোলেন। ফলে গানগুলো তাদের পুরোনো পরিবেশ ছেড়ে চার্চ, সমিতি বা নারী সংস্থায় জায়গা পায়। সেখান থেকে এগুলো শহরের সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। গলি মোড়ের গায়কেরা বা দরজায় দাঁড়ানো কিশোরেরা বকশিশের আশায় সেই পুরোনো সুরেই আবার গান গাইতে শুরু করে। সেই হিসেবে দেখলে, বড়দিনের বিখ্যাত গান ‘গড রেস্ট ইউ মেরি, জেন্টলমেন’ কিন্তু অত পুরোনো নয়, বরং এক নতুন রূপে ফিরে আসা গান।

এমনকি নিজেদের ‘ঐতিহ্যবাহী’ বা পুরোনো প্রথার সমর্থক বলে দাবি করা দলগুলোর মধ্যেও এই ধরনের অতীতের সাথে সংযোগ কেটে যাওয়ার ঘটনা স্পষ্ট দেখা যায়। সাধারণ মানুষ যাদের ইতিহাসের আসল ধারক মনে করে (যেমন কৃষকরা), তাদের কাছে গিয়ে সাহায্য চাওয়া দলগুলোর মধ্যেও এটি ঘটেছিল।

আসলে, ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখা বা ফিরিয়ে আনার আন্দোলনগুলো নিজেই প্রমাণ করে যে পুরোনো ধারাবাহিকতা কোথাও না কোথাও ভেঙে গেছে। রোমান্টিক যুগের পর থেকে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এই ধরনের আন্দোলন খুব দেখা যেত। তবে এই সব চেষ্টা কখনোই সত্যি সত্যি কোনো জীবন্ত অতীতকে ধরে রাখতে বা ফিরিয়ে আনতে পারে না। শেষ পর্যন্ত এগুলো ইনভেন্টেড ট্র্যাডিশনেই রূপ নেয়।

তবে সত্যিকারের পুরানো ঐতিহ্যের যে নিজস্ব শক্তি আর টিকে থাকার ক্ষমতা আছে, তাকে আবার ইনভেন্টেড ট্র্যাডিশনের সাথে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। যেখানে পুরোনো নিয়মকানুন এমনিতেই সমাজে এখনো বেঁচে আছে, সেখানে সেগুলোকে নতুন করে বানানোর বা ফিরিয়ে আনার কোনো দরকারই পড়ে না।

কিন্তু কখনো কখনো পুরোনো জিনিসগুলো আর সমাজে চলছে না বলেই যে নতুন ঐতিহ্য বানানো হয়, তা নয়। অনেক সময় ইচ্ছে করেই পুরোনো নিয়মগুলোকে ব্যবহার না করে দূরে সরিয়ে রাখা হতো।

যেমন, উনবিংশ শতাব্দীতে উদারপন্থী রাজনীতিকরা পুরোনো সমাজের ধারাবাহিকতা একদম বাদ দিয়ে নতুন সমাজ বানাতে চেয়েছিলেন। ফলে সমাজে যে খালি জায়গার তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করার জন্য বাধ্য হয়ে তাদের নতুন নতুন প্রথা বানিয়ে নিতে হয়েছিল। অথচ সেই সময়ে ল্যাঙ্কাশায়ারের রক্ষণশীল কারখানার মালিকরা পুরোনো সামাজিক সম্পর্কগুলোকে খুব সুন্দরভাবে নিজেদের কাজে ব্যবহার করেছিলেন। যা প্রমাণ করে যে শিল্প বিপ্লবের মতো নতুন যুগেও সেই পুরোনো সম্পর্কগুলো কিন্তু একদম হারিয়ে যায়নি।

অবশ্য শিল্প বিপ্লবের পর নতুন সমাজের সাথে পুরোনো প্রথাগুলো যে পুরোপুরি তাল মেলাতে পারছিল না, তা সত্যি। তবে পুরোনো জিনিস সাময়িকভাবে বাদ দেওয়া আর তা চিরতরে অকেজো হয়ে যাওয়ার মধ্যকার পার্থক্যটি আমাদের মাথায় রাখতে হবে।

তবে এই পরিস্থিতি কিন্তু নতুন চিন্তার মানুষদের নিজেদের মতো করে ঐতিহ্য বানিয়ে তোলা থেকে আটকে রাখতে পারেনি। ফ্রিম্যাসনরি সংগঠনের আচার-অনুষ্ঠানগুলো এর খুব ভালো উদাহরণ। তবুও অন্ধবিশ্বাস, সংস্কার এবং অন্ধকার অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয় এমন পুরোনো প্রথার প্রতি এক ধরনের বিরূপ মনোভাব কাজ করত। এই কারণে যুক্তি ও আলোকায়নের ওপর বিশ্বাস রাখা দলগুলো, যেমন উদারপন্থী, সমাজতান্ত্রিক এবং কম্যুনিস্টরা পুরোনো বা নতুন যেকোনো ধরনের ঐতিহ্যের প্রতিই কিছুটা উদাসীন ছিল।

তবে সমাজতন্ত্রীরা কীভাবে যেন নিজেরাই বুঝতে না পেরে বা না চেয়েও বছর বছর ‘মে দিবস’ উদযাপনের একটি ঐতিহ্য পেয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে ন্যাশনাল সোশ্যালিস্টরা (নাৎসিরা) এই ধরনের সুযোগগুলোকে খুব সুচতুরভাবে ব্যবহার করত। তারা চরম উৎসাহ আর নিখুঁত নিয়মের সাথে নানা প্রতীক ব্যবহার করে অনুষ্ঠানগুলো সাজাত।

ব্রিটেনের উদারপন্থী যুগে এই ধরনের অনুষ্ঠানগুলোকে বড়জোর সহ্য করে নেওয়া হতো, যতক্ষণ না তা কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কাজে বাধা সৃষ্টি করত। সাধারণ বা নিম্নবর্গের মানুষের এই অযৌক্তিক আবেগকে কখনো কখনো অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিছুটা ছাড় দেওয়া হতো।

যেমন ফ্রেন্ডলি সোসাইটিগুলোর সামাজিক ও আনুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের প্রতি তাদের মনোভাব ছিল মিশ্র। একদিকে তারা এর বিরুদ্ধাচারণ করত এবং প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন, মিছিল, বাদ্যযন্ত্র বাজানো বা বিশেষ পোশাকের পেছনের খরচকে ‘অপ্রয়োজনীয় ব্যয়’ হিসেবে আইন করে নিষিদ্ধ করেছিল। অন্যদিকে আবার বাৎসরিক ভোজের মতো অনুষ্ঠানগুলোকে এই বলে মেনে নিত যে সাধারণ মানুষের কাছে, বিশেষ করে গ্রামের মানুষের কাছে এর আকর্ষণের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত চরম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও যুক্তিবাদ কেবল অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশেই নয়, বরং সামাজিক আদর্শ হিসেবেও রাজত্ব করেছিল।

শিল্প বিপ্লবের পর থেকে তৈরি হওয়া ‘নির্মিত ঐতিহ্য’গুলো নিয়ে কিছু সাধারণ পর্যালোচনার মাধ্যমে এই সূচনা বক্তব্যটি শেষ করা যেতে পারে।

শিল্প বিপ্লবের পর তৈরি হওয়া ঐতিহ্যগুলোকে প্রধানত তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়।

প্রথমত, যেসব ঐতিহ্য মানুষের মধ্যে সামাজিক ঐক্য তৈরি করে কিংবা কোনো বাস্তব বা কাল্পনিক গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।

দ্বিতীয়ত, যেসব ঐতিহ্য কোনো প্রতিষ্ঠান, মানুষের পদমর্যাদা কিংবা কর্তৃপক্ষের ক্ষমতাকে বৈধতা দেয়।

তৃতীয়ত, যেসব ঐতিহ্যের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে সামাজিকীকরণ করা, অর্থাৎ তাদের মধ্যে নির্দিষ্ট বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং আচরণের নিয়মগুলো শিখিয়ে দেওয়া।

এর মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধরনের ঐতিহ্যগুলো খুব সচেতনভাবে বানিয়ে নেওয়া হয়েছিল। যেমন ব্রিটিশ ভারতে সেখানকার কর্তৃপক্ষের কাছে মানুষের আনুগত্য প্রকাশ করার নানা নিয়ম তৈরি করা হয়েছিল। তবে প্রথম ধরনের ঐতিহ্যটিই ছিল সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। কারণ মানুষ যখন কোনো সমাজ, দেশ বা জাতির সাথে নিজেকে মেলাতে শুরু করে, তখন বাকি জিনিসগুলো এর ভেতরেই লুকিয়ে থাকে।

এখানে একটি সমস্যা ছিল যে, এত বড় বড় সমাজগুলো কিন্তু কোনো একটি ছোট একতাবদ্ধ পরিবার বা সুনির্দিষ্ট পদমর্যাদার সমাজ ছিল না। সমাজে এক শ্রেণী থেকে অন্য শ্রেণীতে যাওয়ার সুযোগ, বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং প্রচলিত আদর্শগুলোর কারণে উঁচু-নিচু ভেদ বিশিষ্ট সামাজিক কাঠামো তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। যেমন সেনাবাহিনীর মতো জায়গায় যেভাবে কঠোর পদমর্যাদা মেনে চলা হয়, সব জায়গায় তেমনটা করা সম্ভব ছিল না।

তবে এই সমস্যাটি তৃতীয় ধরনের ঐতিহ্যের কাজে কোনো বাধা সৃষ্টি করেনি। কারণ সাধারণ সামাজিকীকরণের মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিক, দেশের সদস্য এবং রাজার প্রজাদের ভেতরে একই ধরনের মূল্যবোধ শিখিয়ে দেওয়া হতো।

একই সাথে বিভিন্ন সামাজিক দলের নিজস্ব নিয়মকানুনও একে অপরের কাজে বাধা সৃষ্টি করত না। যেমন সাধারণ মানুষের চেয়ে পাবলিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের শেখানো নিয়মগুলো ছিল আলাদা।

অন্যদিকে, এই আধুনিক জগতে যেখানে সবাই আইনের চোখে সমান, সেখানে নতুন ঐতিহ্যগুলো সরাসরি মানুষের পদমর্যাদা বা উঁচু-নিচু পার্থক্য ফিরিয়ে আনতে পারত না। তাদের এটি করতে হতো একটু ঘুরিয়ে বা পরোক্ষভাবে।

যেমন, এমন কিছু আনুষ্ঠানিক প্রতিকী রীতিনীতি চালু করা হতো যা দেখে মনে হতো সবাই এতে রাজি আছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে বৈষম্য রয়েই যেত। ব্রিটেনের রাজার অভিষেক অনুষ্ঠানের নতুন রূপ দেওয়া এর একটি বড় উদাহরণ।

তবে সবচেয়ে বেশি যা দেখা যেত তা হলো, ধনী বা ক্ষমতাশালী অভিজাতদের মনে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি জাগিয়ে তোলা। বিশেষ করে যখন কেউ জন্মসূত্রে অভিজাত হতো না, বরং নতুন করে সেই পদে আসত। সাধারণ মানুষকে বাধ্য করার চেয়ে এই নতুন অভিজাতদের নিজেদের ক্ষমতাশালী মনে করানোই ছিল উদ্দেশ্য।

এটি করার কয়েকটি উপায় ছিল। যেমন, নতুন অভিজাতদের পুরোনো আমলের শাসকগোষ্ঠীর সাথে মিলিয়ে দেওয়া। জার্মানির ক্ষেত্রে তা করা হতো সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক উপায়ে (যেমন তলোয়ার নিয়ে দ্বন্দ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের দল)। আবার ব্রিটেনের ক্ষেত্রে তা করা হতো পাবলিক স্কুলগুলোর নীতি-নৈতিকতা শেখানোর মাধ্যমে।

অথবা বিশেষ কিছু গোপন ও এক্সক্লুসিভ ঐতিহ্যের মাধ্যমে তাদের নিজেদের মধ্যে গভীর সামাজিক বন্ধন, আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা গড়ে তোলা হতো। যেমনটি দেখা যেত ফ্রান্সের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা বিভিন্ন উপনিবেশে থাকা শ্বেতাঙ্গদের ক্ষেত্রে।

ধরে নেওয়া যায় যে, সমাজ বা সম্প্রদায়ভিত্তিক বানিয়ে তোলা ঐতিহ্যগুলোই ছিল সবচেয়ে মূল ধরণের। তবে এগুলোর আসল ধরন কেমন ছিল, তা নিয়ে এখনো গবেষণার দরকার আছে। বানিয়ে তোলা ঐতিহ্য আর সত্যিকারের পুরোনো আচারের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে নৃবিজ্ঞান সাহায্য করতে পারে।

এখানে একটি বিষয় খেয়াল করা যায়, সাধারণত ছোট কোনো গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে মানুষের জীবনের বিশেষ শুভক্ষণ বা পরিবর্তনগুলোকে উৎসবের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হতো। যেমন দলে পদার্পণ করা, পদোন্নতি, অবসর কিংবা মৃত্যু। কিন্তু পুরো একটি রাষ্ট্র বা দেশের মতো বড় পরিসরে এগুলো সচরাচর দেখা যেত না। কারণ দেশ বা রাষ্ট্র নিজেদেরকে সূচনালগ্ন থেকেই একদম চিরন্তন এবং অপরিবর্তনশীল বলে দাবি করে।

অবশ্য নতুন রাজনৈতিক শাসক কিংবা নতুন সামাজিক আন্দোলনগুলো ধর্মের সাথে যুক্ত পুরোনো সংস্কারগুলোর বদলে নিজেদের মতো বিকল্প নিয়ম বের করার চেষ্টা করেছিল। যেমন ধর্মীয় বিয়ের বদলে সিভিল ম্যারেজ বা নাগরিক বিবাহ এবং রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রচলন।

পুরোনো আর বানিয়ে তোলা প্রথার মধ্যে একটি বড় পার্থক্য দেখা যায়। পুরোনো প্রথাগুলো ছিল খুব নির্দিষ্ট এবং কঠোরভাবে মেনে চলার মতো সামাজিক নিয়ম। অন্যদিকে বানিয়ে তোলা প্রথাগুলো মানুষকে ঠিক কী শিক্ষা দিচ্ছে, তাদের দায়িত্ব বা অধিকার কতটুকু, তা বেশ অস্পষ্ট ও ধোঁয়াটে থাকত। যেমন ‘দেশপ্রেম’, ‘আনুগত্য’, ‘দায়িত্ব’, ‘খেলোয়াড়সুলভ মনোভাব’ কিংবা ‘স্কুলের প্রতি ভালোবাসা’ ইত্যাদি ধারণার কথা বলা হতো।

তবে ব্রিটিশ দেশপ্রেম কিংবা ‘আমেরিকানবাদ’-এর সংজ্ঞা যতটা অস্পষ্টই থাক না কেন, এগুলো পালনের নিয়মকানুন কিন্তু প্রায় বাধ্যবাধকতামূলক ছিল। যেমন জাতীয় সংগীত বাজলে ব্রিটেনে উঠে দাঁড়ানো কিংবা আমেরিকার স্কুলে পতাকাকে সম্মান জানানোর নিয়ম।

এখানে মূল বিষয় ছিল এমন কিছু প্রতীক বা চিহ্ন বানিয়ে তোলা, যা মানুষের মন ছুঁয়ে যায় এবং ক্লাবের সদস্য হওয়ার মতো এক ধরনের অনুভূতির জন্ম দেয়। কোনো লিখিত নিয়মকানুনের চেয়ে এই আবেগটাই বেশি কাজ করত।

জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত এবং জাতীয় প্রতীক—এই তিনটি চিহ্নের মাধ্যমেই একটি স্বাধীন দেশ তার নিজের পরিচয় এবং সার্বভৌমত্ব প্রকাশ করে। এই চিহ্নগুলো দেখার সাথে সাথেই মানুষের মনে তাৎক্ষণিক শ্রদ্ধা ও আনুগত্যের জন্ম হয়। এগুলো আসলে পুরো দেশের ইতিহাস, চিন্তাভাবনা এবং সংস্কৃতিকে তুলে ধরে।

এই প্রসঙ্গে ১৮৮০ সালে এক পর্যবেক্ষক বলেছিলেন, সৈনিক ও পুলিশেরা এখন আমাদের প্রতিনিধি হিসেবে ব্যাজ বা প্রতীক পরে থাকে। যদিও তিনি তখন ধারণা করতে পারেননি যে সামনে আসা গণআন্দোলনের যুগে সাধারণ নাগরিকরাও কীভাবে এই প্রতীকগুলো ব্যবহার করতে শুরু করবে।

দ্বিতীয় পর্যবেক্ষণটি হলো, এতো এতো নতুন ঐতিহ্য বানিয়ে তোলার পরেও দেখা যায় যে, পুরোনো ঐতিহ্য আর প্রথার বিলুপ্তির ফলে তৈরি হওয়া ফাঁকা জায়গার খুব ছোট একটা অংশই কেবল এগুলো পূরণ করতে পেরেছে। যে সমাজে মানুষের কাজকর্মের উদাহরণ হিসেবে অতীতের গুরুত্ব দিন দিন কমে যাচ্ছে, সেখানে এমনটা হওয়া খুবই স্বাভাবিক।

সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে কিংবা ছোট কোনো গোষ্ঠীর নিজস্ব জীবনে উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে তৈরি হওয়া এই নতুন ঐতিহ্যগুলোর স্থান ছিল খুবই সামান্য। পুরোনো কৃষিপ্রধান সমাজগুলোতে প্রথা ও ঐতিহ্য যেভাবে স্থান দখল করে রাখত, তার তুলনায় এটি খুবই নগণ্য। বিংশ শতাব্দীর পশ্চিমা নারী-পুরুষের দিনরাত্রি, বছরের বিভিন্ন ঋতু বা জীবনচক্র কেমন চলবে, তা কোনো পুরোনো প্রথা দিয়ে আর ঠিক হয় না। তাদের জীবন এখন অনেক বেশি পরিচালিত হয় অর্থনীতি, প্রযুক্তি, সরকারি আমলাতন্ত্র এবং রাজনীতির মতো বাইরের বাস্তব চাপ দিয়ে। এসব বিষয় কিন্তু আমাদের আলোচিত ‘ঐতিহ্য’-এর ওপর নির্ভর করে না, কিংবা নতুন কোনো ঐতিহ্য তৈরিও করে না।

তবে এই সাধারণ নিয়মটি নাগরিকদের ‘জনজীবন’ বা পাবলিক লাইফের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় (যার মধ্যে স্কুলের মতো সামাজিকীকরণের মাধ্যমগুলোও কিছুটা অন্তর্ভুক্ত, যদিও গণমাধ্যমের মতো ব্যক্তিগত বিষয়গুলো এর বাইরে)।

জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোতে (যেমন সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা সরকারি চাকরিজীবী) কিংবা রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে যেসব প্রথা পালন করা হয়, সেগুলোতে কিন্তু নতুন ঐতিহ্যের ব্যবহার মোটেও কমে যায়নি। প্রকৃতপক্ষে, মানুষ যখনই নিজের নাগরিক পরিচয়ের ব্যাপারে সচেতন হয়ে ওঠে, তখনই সে নানা প্রতীক বা আধো-আনুষ্ঠানিক আচারের মুখোমুখি হয়। যেমন নির্বাচন, যার অনেকটাই নতুন করে বানিয়ে তোলা। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় পতাকা, ছবি, নানাবিধ অনুষ্ঠান এবং গান। শিল্প বিপ্লব ও ফরাসি বিপ্লবের পর থেকে বানিয়ে তোলা ঐতিহ্যগুলো যদি স্থায়ী কোনো ফাঁকা জায়গা পূরণ করে থাকে, তবে তা অবশ্যই সমাজের এই রাজনৈতিক ও নাগরিক জীবনেই ঘটেছে।

সবশেষে একটি প্রশ্ন উঠতে পারে, ইতিহাসবিদদের কেন এই ধরনের বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানো উচিত? এক দিক থেকে এই প্রশ্নটি অহেতুক। কারণ দিন দিন অনেক ইতিহাসবিদই যে এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন, তার প্রমাণ এই বইয়ের লেখাগুলোতেই রয়েছে। তাই প্রশ্নটিকে বরং অন্যভাবে সাজিয়ে নেওয়া যাক। ঐতিহ্য বানিয়ে তোলার এই প্রক্রিয়াটি নিয়ে গবেষণা করে ইতিহাসবিদরা ঠিক কী কী সুবিধা বা নতুন জ্ঞান পেতে পারেন?

প্রথমত বলা যায়, এই বানিয়ে তোলা ঐতিহ্যগুলো সমাজের নানা সমস্যা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হিসেবে কাজ করে। এমন কিছু সমস্যা ও ঘটনাপ্রবাহ যেগুলো অন্য কোনো উপায়ে চেনা বা সময় নির্ধারণ করা কঠিন ছিল, সেগুলোকে চিহ্নিত করতে এরা নির্দেশক হিসেবে সাহায্য করে। এগুলো হলো বাস্তব প্রমাণ।

যেমন, ১৮৯০-এর দশকে জার্মানির জিমনাস্টিক আন্দোলনগুলোর মধ্যে পুরোনো ‘কালো-লাল-সোনালী’ পতাকার জায়গায় দ্রুত নতুন ‘কালো-সাদা-লাল’ রঙের ব্যবহার শুরু হয়। কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা সংগঠনের মুখপাত্রদের কথার চেয়ে এই পতাকার পরিবর্তনই বেশি স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয় কীভাবে জার্মান জাতীয়তাবাদ তার পুরোনো উদারপন্থী রূপ ছেড়ে নতুন সাম্রাজ্যবাদী ও আগ্রাসী রূপ ধারণ করেছিল।

একইভাবে, ব্রিটিশ ফুটবল কাপ ফাইনালের ইতিহাস আমাদেরকে শহরের শ্রমজীবী মানুষের সংস্কৃতি গড়ে ওঠার বিষয়ে এমন কিছু তথ্য দেয়, যা চিরাচরিত ঐতিহাসিক তথ্য বা উৎসে খুঁজে পাওয়া যায় না। ঠিক এই কারণেই বানিয়ে তোলা ঐতিহ্য সংক্রান্ত গবেষণাকে সমাজের সার্বিক ইতিহাস চর্চা থেকে আলাদা করা যায় না। সমাজের বৃহত্তর ইতিহাসের সাথে যুক্ত না করতে পারলে কেবল এই প্রথাগুলো আবিষ্কার করে ইতিহাস চর্চাকে খুব বেশি দূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

দ্বিতীয়ত, এটি অতীতের সাথে মানুষের সম্পর্কের ওপর বেশ আলোকপাত করে, যার ফলে ইতিহাসবিদের নিজের বিষয় ও গবেষণার কাজ সহজ হয়। কারণ সব বানিয়ে তোলা ঐতিহ্যই যতটা সম্ভব ইতিহাসকে তাদের নিজেদের কাজকর্মের বৈধতা প্রমাণ করতে এবং গোষ্ঠীর ঐক্যকে মজবুত করতে ব্যবহার করে।

অনেক সময় এই ইতিহাস আবার সরাসরি লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। যেমন ১৮৮৯ এবং ১৮৯৬ সালে দক্ষিণ টাইরোলে ভালথার ফন ডের ফোগেলভাইডে এবং দান্তের ভাস্কর্য নির্মাণকে কেন্দ্র করে যে বিবাদ ও লড়াই তৈরি হয়েছিল।

এমনকি বিপ্লবী আন্দোলনগুলোও তাদের নতুন নতুন উদ্যোগের সমর্থনে সাধারণ মানুষের ইতিহাসের কথা টেনে আনত। যেমন নর্মানদের বিরুদ্ধে স্যাক্সনদের লড়াই, ফ্র্যাঙ্কদের বিরুদ্ধে গলের অধিবাসীদের লড়াই, কিংবা স্পার্টাকাসের ইতিহাস। তারা বিপ্লবের ঐতিহ্য এবং নিজেদের বীর ও শহীদদের কথা স্মরণ করত। এঙ্গেলস তাঁর ‘পিজেন্ট ওয়ার ইন জার্মানি’ বইয়ের শুরুতেই বলেছিলেন, ‘জার্মান জনগণেরও নিজস্ব বিপ্লবী ঐতিহ্য রয়েছে’। জেমস কনোলির ‘লেবার ইন আইরিশ হিস্ট্রি’ বইটিতে এই বিষয়গুলোর চমৎকার প্রকাশ দেখা যায়।

ঐতিহ্য বানিয়ে তোলার এই বিষয়টি এখানেই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ কোনো জাতি, রাষ্ট্র বা আন্দোলনের ভাবাদর্শ হিসেবে যে ইতিহাসটি মানুষের জানা-শোনার অংশ হয়ে ওঠে, তা আসলে সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে টিকে থাকা আসল ইতিহাস নয়। বরং তা হলো সেই ইতিহাস যা কিছু নির্দিষ্ট মানুষ নিজেদের স্বার্থে বেছে নিয়েছে, লিখেছে, ছবি এঁকে প্রকাশ করেছে, জনপ্রিয় করেছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

মৌখিক ইতিহাস নিয়ে কাজ করা গবেষকরা প্রায়ই দেখেছেন যে, ১৯২৬ সালের বিখ্যাত ‘সাধারণ ধর্মঘট’ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের স্মৃতি সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সাধারণ ছিল, ততটা নাটকীয় ছিল না। ফরাসি তৃতীয় প্রজাতন্ত্রের সময়ে ফরাসি বিপ্লবের একটি বিশেষ চিত্র কীভাবে তৈরি করা হয়েছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

তবে সব ইতিহাসবিদই জেনে বা না জেনে এই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত থাকেন। তারা সচেতনভাবে বা অজান্তেই অতীতের এমন সব প্রতিচ্ছবি তৈরি করেন, ভেঙে ফেলেন কিংবা পুনর্নির্মাণ করেন যা কেবল গবেষকদের ঘরোয়া আলোচনার বিষয় নয়, বরং রাজনৈতিক জীব হিসেবে সাধারণ মানুষের পরিমণ্ডলের সাথেও সরাসরি যুক্ত। ইতিহাসবিদদের উচিত তাদের কাজের এই দিকটি সম্পর্কে ভালোভাবে সচেতন থাকা।

এই প্রসঙ্গে আধুনিক ও সমসাময়িক ইতিহাসবিদদের জন্য ‘বানিয়ে তোলা ঐতিহ্য’-এর একটি বিশেষ গুরুত্ব আলাদাভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। আধুনিককালের একটি অন্যতম বড় আবিষ্কার হলো ‘জাতি’ (nation)। আর এই জাতির সাথে যুক্ত নানা বিষয়, যেমন জাতীয়তাবাদ, জাতি-রাষ্ট্র, জাতীয় প্রতীক, জাতীয় ইতিহাস এবং অন্যান্য সবকিছু বোঝার জন্য বানিয়ে তোলা ঐতিহ্যের ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এসব কিছুই আসলে ‘সামাজিক প্রকৌশল’ বা চিন্তাভাবনা করে সমাজ গড়ে তোলার চেষ্টার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই চেষ্টাগুলো প্রায়ই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সব সময়ই নতুন। কারণ ঐতিহাসিক যেকোনো নতুনত্ব মানেই তো নতুন কিছুর উদ্ভাবন।

ইসরায়েলি বা ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদ বা জাতিসত্তা কিন্তু একদমই নতুন বিষয়, ইহুদি বা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানদের প্রাচীন ইতিহাস যাই থাক না কেন। কারণ ওই অঞ্চলে আধুনিক ভূখণ্ডভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা এক শতাব্দী আগেও প্রায় অচিন্তনীয় ছিল এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষের আগে তা বাস্তবতার মুখ দেখেনি।

স্কুলে শেখানো বা লেখার জন্য ব্যবহৃত প্রমিত বা মান জাতীয় ভাষাগুলোও কিন্তু বেশ নতুন সৃষ্টি। অথচ একটা সময় কেবল হাতে গোনা কয়েকজন অভিজাত মানুষ ছাড়া সাধারণ মানুষ এই ভাষায় কথা বলত না। ফ্লেমিশ ভাষার এক ফরাসি ইতিহাসবিদ খুব সঠিকভাবে বলেছিলেন যে, বেলজিয়ামে আজ স্কুলে যেসব ফ্লেমিশ ভাষা শেখানো হয়, তা ফ্ল্যান্ডার্সের মায়েরা বা নানি-দাদিরা তাদের বাচ্চাদের সাথে বলতেন না। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এটি রূপক অর্থে ‘মাতৃভাষা’ হলেও হুবহু সেই প্রাচীন মাতৃভাষা নয়।

তবে একটি অদ্ভুত অথচ সহজবোধ্য বৈপরীত্য আমাদের ভুল পথে চালিত করতে পারে। আধুনিক জাতিগুলো এবং তাদের সাথে যুক্ত উপাদানগুলো নিজেদের সব সময় ‘নতুন’ না বলে বরং সুদূর অতীতের সাথে যুক্ত বলে দাবি করে। তারা বলতে চায়, তারা নাকি কৃত্রিমভাবে তৈরি কোনো সমাজ নয়, বরং অত্যন্ত ‘প্রাকৃতিক’ মানবগোষ্ঠী, যাদের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য আলাদা কোনো সংজ্ঞারই প্রয়োজন নেই।

আধুনিক ‘ফ্রান্স’ বা ‘ফরাসি’ ধারণার পেছনে প্রাচীন যে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাই থাকুক না কেন (যা কেউ অস্বীকার করে না), এর ভেতরেও কিন্তু নতুন করে গড়ে নেওয়া বা ‘বানিয়ে তোলা’ অনেক উপাদান রয়েছে।

যেহেতু একটি আধুনিক ‘জাতি’ মানসিকভাবে এই ধরনের কৃত্রিম উপাদানের ওপর নির্ভর করে গঠিত হয় এবং সাম্প্রতিক সময়ের প্রতীক বা বানিয়ে তোলা আলোচনার (যেমন ‘জাতীয় ইতিহাস’) সাথে যুক্ত থাকে, তাই বানিয়ে তোলা ঐতিহ্যের বিষয়টি ভালোভাবে না বুঝে কোনো জাতির গঠন ও ইতিহাসকে সঠিকভাবে জানা সম্ভব নয়।

ঐতিহ্য বানিয়ে তোলার এই বিষয় নিয়ে গবেষণা হলো একটি বহুশাস্ত্রীয় (interdisciplinary) কাজ। এটি গবেষণার এমন একটি ক্ষেত্র যা ইতিহাসবিদ, সামাজিক নৃবিজ্ঞানী এবং মানববিজ্ঞান চর্চাকারী আরও অন্যান্য নানা পেশার মানুষদের একসাথে নিয়ে আসে। এই ধরনের যৌথ উদ্যোগ বা সহযোগিতা ছাড়া এই বিষয়ে সঠিকভাবে গবেষণা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *