সুদের ঘানি ও শরয়ি বিকল্প || বাংলাদেশের ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটের একটি ফিকহি-নীতিগত মূল্যায়ন

নির্বাহী সারসংক্ষেপ
জাতীয় বাজেট বক্তব্যকে সাধারণত অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী কিংবা রাজনৈতিক বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে বিচার করা হয়। কিন্তু এই ২৪০ পৃষ্ঠার বিশাল দলিলকে একজন ফিকহের ছাত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র উঠে আসে। যেকোনো দলিলকে ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণের একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে—প্রথমত সমস্যা চিহ্নিতকরণ, দ্বিতীয়ত সেই সমস্যার কারণ অনুসন্ধান এবং তৃতীয়ত সমস্যা থেকে উত্তরণের বাস্তবসম্মত বিকল্প উপস্থাপন।
এই তিনটি স্তরের মানদণ্ডে বিশ্লেষণ করলে বাজেট বক্তব্যে অন্তত ১৪ থেকে ১৫টি স্বতন্ত্র ফিকহি ইস্যু চিহ্নিত করা সম্ভব। এর মধ্যে সবচেয়ে মৌলিক ও গুরুতর সমস্যাটি হলো রাষ্ট্রীয় ঋণ ও সুদব্যয়ের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। চলতি অর্থবছরে কেবল সুদ পরিশোধেই ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ১৩.৫৯ শতাংশ। এই বিপুল অঙ্ক একটি অন্তহীন দুষ্টচক্রের ইঙ্গিত বহন করে।
এই প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে যে, সুদভিত্তিক ঋণের বিকল্প হিসেবে সুকুক, সেল অ্যান্ড লিজব্যাক এবং আন্তর্জাতিক শরিয়াসম্মত অর্থায়নের বাস্তব সুযোগ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্র সেই পথে হাঁটেনি। শরিয়া-কমপ্লায়েন্ট অর্থায়ন কেবল ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার বিষয় নয়, বরং এটি একটি অধিকতর টেকসই ও স্থিতিশীল উৎস।
১. ভূমিকা: একটি নতুন বিশ্লেষণী রীতির সূচনা
দীনি শিক্ষার পরিসরে জাতীয় বাজেট নিয়ে ফিকহি আলোচনা এখনও অপরিচিত এক ভূখণ্ড। অথচ ‘তাফাক্কুহ ফিদ-দীন’ বা ফিকহ চর্চার মূল উদ্দেশ্যই হলো মানুষকে সতর্ক করা। যে দলিলটি সমগ্র জাতির আয়-ব্যয়ের হালাল-হারামের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, তাকে ফিকহি দৃষ্টিতে যাচাই করা তাই কেবল বৈধ নয়, অপরিহার্য।
এই আলোচনার লক্ষ্য বৃহৎ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো নয়, বরং একটি রেওয়াজের সূচনা করা। প্রত্যাশা এই যে, আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাজেট বক্তব্যের ওপর নিয়মিত ফিকহি মজলিস অনুষ্ঠিত হবে। একজন তালিবে ইলম কীভাবে একটি অর্থনৈতিক দলিলকে শরিয়ার নিরিখে বিশ্লেষণ করতে পারেন, তারই একটি প্রাথমিক অনুশীলন এই প্রবন্ধ।
১.১ বিশ্লেষণের পূর্বেই একটি কাঠামোগত পর্যবেক্ষণ
ফিকহি ইস্যুতে প্রবেশের আগে বাজেট বক্তব্যের গঠন নিয়েই একটি মৌলিক পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। আমাদের বাজেট বক্তব্য প্রায় ২৪০ পৃষ্ঠার বিশাল এক দলিল। প্রতিবেশী ভিয়েতনাম, নেপাল, পাকিস্তান কিংবা ভারত—কারও বাজেট বক্তব্যই এত দীর্ঘ নয়। আমাদের চেয়ে বহুগুণ বড় দেশ ভারতের বাজেট বক্তব্য ৪০ থেকে ৫০ পৃষ্ঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, পাকিস্তানেরটিও ৫০ পৃষ্ঠার নিচে। আর তাদের বক্তব্যে রাজনৈতিক প্রশস্তির কোনো অবকাশ নেই।
অথচ আমাদের বক্তব্যে বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক গুণকীর্তনের প্রবণতা লক্ষণীয়। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো তুলনার পদ্ধতি। এই বক্তব্যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বর্তমান অর্থনীতির তুলনা টানা হয়েছে প্রায় ২০ বছর আগের অর্থব্যবস্থার সঙ্গে। কুড়ি বছর আগের জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক আয়তন ও বাস্তবতা আজকের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই মিলবে না। ফলে এই তুলনা থেকে যে পার্থক্য দৃশ্যমান হয়, তা অনিবার্য—এবং কিছুটা বিভ্রান্তিকরও বটে।
এখানে একটি সূক্ষ্ম শুভঙ্করের ফাঁকিও লুকিয়ে আছে। বর্তমান বাজেট বক্তব্যে ঠিক পূর্ববর্তী অর্থবছরের কোনো তুলনামূলক আলোচনাই অনুপস্থিত। অথচ পূর্ববর্তী বছরের সঙ্গে তুলনা করাই স্বাভাবিক রীতি, কারণ তাতে সাম্প্রতিক প্রবণতা স্পষ্ট হয়। দূরবর্তী অতীতের সঙ্গে তুলনা করে বহুদূরের একটি ব্যবধান দেখানো হয়, কিন্তু নিকটবর্তী চিত্রটি আড়ালেই থেকে যায়। এই কাঠামোগত অপরিপক্বতা বক্তব্যটিকে দুর্বল করে তুলেছে।
২. প্রধান ইস্যু: সুদব্যয়ের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ
২.১ সংখ্যার ভাষায় সংকট
বাজেট বক্তব্যের ১২ নম্বর পৃষ্ঠার ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় উৎস থেকে অর্থের সংস্থান করতে হয়েছে। এই সংখ্যাগুলোর গতিপ্রকৃতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
দুই দশক আগে দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণ ছিল প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকায়—অর্থাৎ প্রায় ১৬ গুণ বৃদ্ধি। একইভাবে সুদব্যয় দুই দশক আগে ছিল মাত্র ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ১৩ গুণ বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। আর বর্তমান বাজেটে এই সুদব্যয়ের অঙ্ক আরও স্ফীত হয়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকায়।
মোট ৯ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার বাজেটে কেবল সুদ পরিশোধ বাবদই চলে যাচ্ছে এই বিপুল অর্থ, যা মোট বাজেটের ১৩.৫৯ শতাংশ। এই ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা মূল ঋণের পরিমাণ (প্রিন্সিপাল) নয়, কেবল সুদের অংশ (ইন্টারেস্ট)। মূল ঋণের সমষ্টি হিসাব করলে তা আরও বহুগুণ বেশি। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা বাজেটের ১৩ টাকারও বেশি নিছক সুদ পরিশোধেই ব্যয় হয়ে যাচ্ছে।
২.২ ঋণের উৎস: বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ
এই ঋণের উৎস মূলত দুটি—বৈদেশিক ও দেশীয়। বৈদেশিক উৎসের মধ্যে রয়েছে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং ভারত, চীন ও রাশিয়ার মতো কয়েকটি দেশ। এই তালিকায় একটি নাম বিশেষভাবে অনুপস্থিত। সেটা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো মুসলিম রাষ্ট্র। আকিদা, বিশ্বাস ও দর্শনগত সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও আমরা কোনো মুসলিম দেশের সঙ্গে টেকসই আন্তর্জাতিক আর্থিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারিনি। এটি নিঃসন্দেহে আমাদের একটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা।
অন্যদিকে দেশীয় উৎস বলতে মূলত ব্যাংকিং খাত। সরকার ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ঋণ সংগ্রহ করে এবং তার বিপরীতে সুদসহ অর্থ পরিশোধ করে। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের সুদভিত্তিক ঋণের সবচেয়ে বড় উৎসই হলো এই নিজস্ব ব্যাংকিং সেক্টর। এই ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদই মূলত সেই ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকার বোঝা তৈরি করছে।
২.৩ ফিকহি মাসআলা: রাষ্ট্র কি সুদে ঋণ নিতে পারে?
এখানে স্বাভাবিকভাবেই একটি ফিকহি প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, রাষ্ট্র কি আদৌ সুদে ঋণ নিতে পারে? বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, এখানে সুদ গ্রহণের প্রশ্ন নয়, বরং সুদ প্রদানের প্রশ্ন। ঋণগ্রহীতা হিসেবে সরকার সুদ পরিশোধ করছে।
এই মাসআলার একটি চমৎকার প্রায়োগিক কাঠামো উপস্থাপন করেছে মালয়েশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ব্যাংক নেগারা মালয়েশিয়া’। তাদের শরিয়া অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলের (SAC) পরামর্শে ইস্যুকৃত ‘দারুরা ও হাজা’ নীতিমালায় সুস্পষ্ট প্যারামিটার দেওয়া হয়েছে—কোন পরিস্থিতিকে ‘হাজত’ এবং কোন পরিস্থিতিকে ‘দারুরা’ হিসেবে গণ্য করা হবে। সেখানে দেখানো হয়েছে, যখন রাষ্ট্রের হাতে আর কোনো বৈধ উৎস অবশিষ্ট থাকে না, অর্থাৎ প্রকৃত অর্থে ‘দারুরা’ বা অনিবার্য প্রয়োজন তৈরি হয়, তখন আইএমএফ থেকে সুদভিত্তিক ঋণ গ্রহণ জায়িজ হতে পারে।
‘দারুরা’র নীতি প্রয়োগের অপরিহার্য শর্ত হলো, সম্ভাব্য সকল হালাল উৎস যথাযথভাবে অন্বেষণ করা। বাংলাদেশ কি কখনো তার বাজেট ঘাটতি হালাল উপায়ে পূরণের কোনো আন্তরিক প্রচেষ্টা প্রদর্শন করেছে? উত্তর হলো—করেনি। ফলে এই নীতির আলোকে বিদ্যমান সুদভিত্তিক ঋণকে অনায়াসে জায়িজ বলার সুযোগ এখানে নেই।
৩. শরিয়াসম্মত বিকল্পের সন্ধান
সমস্যা চিহ্নিত করা এবং তার কারণ অনুসন্ধানের পর আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—বিকল্প কী? বাংলাদেশের হাতে কি সুদভিত্তিক ঋণ ছাড়া চলার বাস্তব সুযোগ ছিল? বিশ্লেষণে অন্তত চারটি সুস্পষ্ট বিকল্প উঠে আসে।
বৈদেশিক ঋণের প্রয়োজন হলে একটি মুসলিম দেশ হিসেবে আমাদের প্রথম গন্তব্য হওয়া উচিত ছিল মধ্যপ্রাচ্যের সেসব রাষ্ট্র, যাদের সঙ্গে আমাদের বিশ্বাস ও দর্শনগত ঐক্য রয়েছে। যেমন আবুধাবির আন্তর্জাতিক তহবিলের কাছে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে কোনো শরিয়া ইনস্ট্রুমেন্টের অধীনে আর্থিক সহায়তা চাওয়া যেত। অথচ আইএমএফের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ঋণদাতাদের তালিকায় মধ্যপ্রাচ্যের কোনো নাম নেই। রয়েছে কেবল চীন, রাশিয়া, ভারত ও আইএমএফ। এই সম্ভাব্য দুয়ারে আমরা কখনো কড়া নাড়িনি।
অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি তথ্য হলো, আইএমএফের নিজস্ব একটি ইসলামিক ফাইন্যান্সিয়াল উইং এবং একটি এক্সটার্নাল শরিয়া বোর্ড রয়েছে। মুসলিম দেশগুলো যেন শরিয়াসম্মত উপায়ে আর্থিক সহায়তা পেতে পারে, সে উদ্দেশ্যেই এই কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশ সরকার কখনো এই সুযোগের দ্বারে কড়া নাড়েনি। সংসদে এ নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত ছিল, অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠি দেওয়া উচিত ছিল—এসব উদ্যোগের কোনোটিই গৃহীত হয়নি।
এখানে শরিয়া-কমপ্লায়েন্ট উৎসের কথা কেবল ধর্মীয় আবেগ থেকে বলা হচ্ছে না। এটি বলা হচ্ছে এই কারণে যে, এই উৎসটি অধিকতর টেকসই ও স্থিতিশীল। সুদভিত্তিক ঋণের অস্থিরতার তুলনায় শরিয়াভিত্তিক অর্থায়ন রাষ্ট্রের জন্য অনেক বেশি নিরাপদ ভিত্তি প্রদান করে।
উন্নয়নকাজ—রাস্তাঘাট, সেতু বা অবকাঠামো নির্মাণের জন্য সুদভিত্তিক ঋণই একমাত্র পথ নয়। এর সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প হলো সুকুক। সুকুক আসলে কোনো নির্দিষ্ট চুক্তির (আকদ) নাম নয়, বরং একটি ধারণাগত কাঠামো, যার আন্ডারলাইন কন্ট্রাক্ট ইজারা, মুদারাবা বা মুশারাকা—নানা রূপ নিতে পারে।
সুকুকের একটি অতিরিক্ত মাত্রিক সুবিধা রয়েছে, যা সামাজিক ও রাজনৈতিক। উদাহরণস্বরূপ, বিশাল মেট্রোরেল প্রকল্পটি যদি কোটি কোটি টাকার সুদভিত্তিক ঋণে নয়, বরং সুকুকের মাধ্যমে নির্মিত হতো, তবে জুলাইয়ের গণআন্দোলনের সময় জনতা হয়তো তা ভাঙতে যেত না। কারণ তখন প্রতিটি নাগরিক অনুভব করত—“এই মেট্রো আমাদের সম্পদে, আমাদের অর্থে নির্মিত; এতে আমারও মালিকানা রয়েছে।” সুকুক মানেই শেয়ার, আর শেয়ারহোল্ডার নিজের সম্পত্তি ধ্বংস করে না।
গ্রামীণ ব্যাংকিং মডেলে যদি সামান্য কয়েক হাজার টাকার বিনিময়ে একজন গ্রামীণ নারীকে ব্যাংকের ‘মালিক’ বলে অভিহিত করা যায়, তবে সুকুকের মাধ্যমে জনগণকে জাতীয় অবকাঠামোর প্রকৃত মালিকানা দেওয়া কেন সম্ভব নয়? মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া তাদের অভ্যন্তরীণ ঋণের সিংহভাগই সুকুকের মাধ্যমে পূরণ করে থাকে।
সুকুক মূলত সম্পদ সৃষ্টিকারী উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য অধিক উপযোগী। কিন্তু যেখানে পরিচালন ব্যয় মেটানোর জন্য অর্থের প্রয়োজন, সেখানে দেশীয় উৎস থেকে বৈধ উপায়ে অর্থ সংগ্রহের একটি কার্যকর মডেল হলো ‘সেল অ্যান্ড লিজব্যাক’। এটিও মূলত সুকুকের একটি রূপ, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র তার বিদ্যমান সম্পদ কাজে লাগিয়ে সুদমুক্ত তারল্য সংগ্রহ করতে পারে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বর্তমানে সুকুকের ব্যবহার শুরু হয়েছে, তবে তা এখনও চূড়ান্ত আদর্শ পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বাংলাদেশ সুকুকের টেকনিক্যাল কমিটিতে যুক্ত থেকে কিছু ইতিবাচক ফলাফল অর্জিত হলেও, এখানে আরও উন্নত আউটপুটের যথেষ্ট সুযোগ রয়ে গেছে।
৪. আরও যে ইস্যুগুলো অপেক্ষমাণ
বাজেট বক্তব্যে সুদ কেবল একটি অনুচ্ছেদে সীমাবদ্ধ নয়; নানা স্থানে এর উপাদান ছড়িয়ে আছে। সুদভিত্তিক ঋণের এই একটি ইস্যু ছাড়াও প্রাথমিক বিশ্লেষণে অন্তত ১৪ থেকে ১৫টি স্বতন্ত্র ফিকহি ইস্যু চিহ্নিত করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে।
এর মধ্যে রয়েছে মুদ্রানীতি ও পলিসি রেটের প্রশ্ন। বক্তব্যের ১২ পৃষ্ঠার ২২ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় নীতিসুদ হার ক্রমান্বয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। পলিসি রেট বা নীতিসুদ হার হলো সেই হার, যে হারে বাণিজ্যিক ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। এখানে ফিকহি প্রশ্ন হলো—কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর তারল্য সুবিধা পাওয়ার জন্য এমন সুদমুক্ত ইনস্ট্রুমেন্ট প্রয়োজন, এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও পলিসি রেটের বিকল্প কোনো সুদমুক্ত পন্থা ভাবা জরুরি। রেপো, রিভার্স রেপো, এসএলআর ও সিআরআরের ইসলামি ইনস্ট্রুমেন্ট নিয়ে ইতোমধ্যে যথেষ্ট গবেষণা রয়েছে।
খেলাপি ঋণ ও আমানতের খিয়ানত আরেকটি গুরুতর ইস্যু। প্রচলিত ব্যাংকিংয়ে আমানতকারী নিছক পাওনাদার হওয়ায় প্রকৃত ঝুঁকি বহন ছাড়াই সুদ গ্রহণ করেন; অথচ ব্যাংক ব্যর্থ হলে সেই ঝুঁকির বোঝা গিয়ে পড়ে আমানতকারীর ওপরই। এটি ন্যায্যতার নীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এর বিকল্প হতে পারে মুদারাবাভিত্তিক আমানত কাঠামো, যেখানে লাভ-ক্ষতির প্রকৃত অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
এর পাশাপাশি রয়েছে পুঁজিবাজার ও শরিয়াহ ইনডেক্স সংক্রান্ত প্রসঙ্গ। ঢাকা ও চট্টগ্রাম—উভয় স্টক এক্সচেঞ্জেই শরিয়াহ ইনডেক্স বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও বাজেট বক্তব্যে এর কোনো উল্লেখ নেই। সমগ্র পুঁজিবাজারকে শরিয়াহসম্মত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো এই শরিয়াহ ইনডেক্সকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করে তোলা।
এছাড়াও তালিকায় রয়েছে ঋণভিত্তিক থেকে ইকুইটিভিত্তিক অর্থনীতির অভিমুখ, সুকুক বন্ডের কাঠামো, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে ইকুইটি বিনিয়োগ, সুদভিত্তিক কৃষিঋণ ভর্তুকি মডেল, বীমা ও পুনর্বীমার প্রিমিয়াম কর, আয়কর আইনে অ্যাক্রুয়াল ভিত্তিতে সুদব্যয়ের বৈধতা প্রদান, ওয়াকফভিত্তিক সম্পত্তি উদ্ধারের পরিকল্পনার অনুপস্থিতি এবং যাকাতভিত্তিক কাঠামো বনাম ইসলামি রাজস্ব দর্শনের আলোচনার অভাব।
৫. উপসংহার
একটি জাতীয় বাজেট বক্তব্যকে ফিকহের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণের এই প্রচেষ্টা মূলত একটি সূচনা মাত্র। এখানে কেবল একটি ইস্যু—রাষ্ট্রীয় ঋণ ও সুদব্যয়ের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ—নিয়ে সমস্যা চিহ্নিতকরণ, কারণ অনুসন্ধান ও বিকল্প উপস্থাপনের ত্রিমাত্রিক পদ্ধতিতে আলোচনা করা হয়েছে।
মূল বার্তাটি স্পষ্ট। রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে রাতারাতি ইসলাম প্রতিষ্ঠা করে ফেলা কোনো সহজ কাজ নয়; ক্ষমতা দখলই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। বরং ইসলামের নীতি অনুযায়ী একটি রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হলে এই কঠিন প্রশ্নগুলোর সুনির্দিষ্ট উত্তর প্রস্তুত রাখতে হবে—কীভাবে সুদমুক্ত মুদ্রানীতি পরিচালিত হবে, কীভাবে সুকুকের মাধ্যমে উন্নয়ন হবে, কীভাবে শরিয়াসম্মত উৎস থেকে ঘাটতি পূরণ হবে। এসব প্রশ্নের উত্তর প্রস্তুত না রেখে কেবল আদর্শের স্লোগান দিয়ে একটি আধুনিক অর্থব্যবস্থা চালানো অসম্ভব।
এই কারণেই বাজেট বক্তব্যের ফিকহি পর্যালোচনা অপরিহার্য। এর সবচেয়ে বড় ফায়দা সচেতনতা তৈরি—আমাদের তালিবে ইলমদের মধ্যে যেন দেশের অর্থব্যবস্থা নিয়ে আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসা জন্ম নেয়। প্রত্যাশা এই যে, বিতাওফিকিল্লাহ, বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তে একদিন বাজেট বক্তব্যের ওপর নিয়মিত ফিকহি আলোচনার একটি সুদৃঢ় রেওয়াজ প্রতিষ্ঠিত হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সেই তাওফিক দান করুন।







Comments