Skip to content
অর্থনীতিJuly 21, 2026

বাংলার ঐশ্বর্য ও দারিদ্র্যায়ন: একটি প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক পাঠ

চতুর্দশ শতাব্দীতে মরক্কোর পরিব্রাজক ইবনে বতুতা যখন বাংলায় এসে পৌঁছান, তখন তাঁর অভিজ্ঞতার থলিতে ছিল প্রায় তিন দশকের এক দীর্ঘ ভ্রমণজীবন। উত্তর আফ্রিকার মরুভূমি থেকে শুরু করে মিসর, শাম, আনাতোলিয়া, পারস্য, পূর্ব আফ্রিকার উপকূল, ভারত এবং ভারত মহাসাগরের অসংখ্য বন্দর—সমকালীন বিশ্বের যে কটি অঞ্চলকে সমৃদ্ধি ও বাণিজ্যের কেন্দ্র বলা হতো, তার অধিকাংশই তিনি নিজের চোখে দেখে এসেছিলেন। ফলে বাংলা সম্পর্কে তাঁর মন্তব্যকে কোনো অপরিচিত দেশের প্রতি এক পর্যটকের সাময়িক মুগ্ধতা বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং তাঁর বিস্ময়ের পেছনে ছিল তুলনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।
বাংলায় এসে যে বিষয়টি তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছিল, তা ছিল এখানকার বাজারের প্রাচুর্য, খাদ্যের সহজলভ্যতা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অস্বাভাবিক স্বল্পমূল্য। তাঁর রিহলা-য় তিনি লিখেছেন, অল্প কয়েকটি রুপার মুদ্রায় এমন পরিমাণ চাল কেনা যেত, যা তাঁর কাছে প্রায় অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তিনি বাংলাকে আখ্যায়িত করেছিলেন—”নেয়ামতে পরিপূর্ণ এক জাহান্নাম”। কথাটির দ্বিতীয় অংশটি ছিল এখানকার আর্দ্র আবহাওয়া ও পরিবেশ নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত অস্বস্তির প্রতিফলন; কিন্তু প্রথম অংশটি—”নেয়ামতে পরিপূর্ণ”—ছিল বাংলার অর্থনৈতিক জীবন সম্পর্কে তাঁর অকপট স্বীকৃতি।
ইতিহাসের বইয়ে ইবনে বতুতার এই উক্তিটি অসংখ্যবার উদ্ধৃত হয়েছে। কিন্তু তিনি ঠিক কী দেখে এতটা বিস্মিত হয়েছিলেন, সে প্রশ্নটি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। তিনি কেবল উর্বর জমি বা ভালো ফসল দেখেননি। তিনি এমন একটি সমাজ দেখেছিলেন, যেখানে কৃষি, বাজার এবং দৈনন্দিন জীবন দীর্ঘ সময় ধরে একটি স্থিতিশীল ছন্দে চলে আসছিল। এমন ছন্দ, যা কেবল প্রাকৃতিক প্রাচুর্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
কারণ উর্বর ভূমি পৃথিবীর আরও বহু অঞ্চলে ছিল। বড় নদীও ছিল। মৌসুমি বৃষ্টিপাতও ছিল। কিন্তু সেই প্রাকৃতিক সম্পদকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উৎপাদনশীলতা, বাজারের স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে পেরেছে খুব অল্প কয়েকটি সমাজ। ইতিহাসের ভাষায়, সেই সক্ষমতার নাম—প্রতিষ্ঠান (institutions)।
যদি বাংলার সমৃদ্ধির একমাত্র কারণ তার উর্বর মাটি, নদীনির্ভর কৃষি এবং অনুকূল জলবায়ু হয়ে থাকে, তাহলে একই ভূগোলের বাংলা কয়েক শতাব্দী পর ১৭৭০ এবং ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সাক্ষী হলো কীভাবে? এই প্রশ্নটা কি স্বাভাবিকভাবেই আসে না?
নদীগুলো তো পাল্টে যায়নি। মৌসুমি বৃষ্টিপাতের মৌলিক চরিত্রও বদলায়নি। বদলে গিয়েছিল মানুষের তৈরি সেইসব প্রতিষ্ঠান, যেগুলো কৃষি, বাজার, সম্পদের প্রবাহ এবং সামাজিক নিরাপত্তাকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করে রেখেছিল।
তাই বাংলার ইতিহাসকে কেবল এক শাসক থেকে আরেক শাসকের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ইতিহাস হিসেবে পড়লে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি অধরাই থেকে যায়। আরও জরুরি হলো এই প্রশ্নটি করা যে, কোন প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে সমাজকে ধারণ করেছিল? কোনগুলো নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিজেদের রূপ বদলেছিল? আর কোনগুলো একসময় ভেঙে পড়েছিল?
অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ ডগলাস নর্থ এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক কাঠামো দিয়েছেন। তাঁর মতে, কোনো সমাজের দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ বা ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে সেই সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক বিন্যাসের ওপর—অর্থাৎ এমন সব নিয়ম, রীতি ও সংগঠনের ওপর, যা মানুষের অর্থনৈতিক আচরণ, সম্পদের ব্যবহার এবং ক্ষমতার সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করে।
বাংলার ইতিহাসও এই দৃষ্টিকোণ থেকে পড়লে ভিন্নভাবে ধরা দেয়। সুলতানি আমলের শক্তি কেবল উর্বর বদ্বীপ বা ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যের সঙ্গে সংযুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর পেছনে কাজ করছিল এমন কিছু প্রতিষ্ঠান, যেগুলো কৃষি, বাজার এবং সামাজিক কল্যাণকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে বেঁধে রেখেছিল। এই প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের অন্তত তিনটি স্তম্ভ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম স্তম্ভ ছিল কৃষি-সংবেদনশীল রাজস্বব্যবস্থা। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র থেকে বোঝা যায়, সুলতানি আমলে ভূমি-রাজস্ব নির্ধারণে কৃষি উৎপাদনের বাস্তব অবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। ভালো ফলনের বছরে রাজস্ব বাড়লেও বন্যা, খরা কিংবা অন্যান্য দুর্যোগে রাজস্ব হ্রাস বা মওকুফের নজিরও পাওয়া যায়। অর্থাৎ উৎপাদনের সমস্ত ঝুঁকি একতরফাভাবে কৃষকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতো না; রাষ্ট্রও সেই ঝুঁকির একটি অংশ বহন করত। আধুনিক রাজনৈতিক অর্থনীতির ভাষায় একে ঝুঁকি-বণ্টনের একটি ঐতিহাসিক রূপ বলা যায়।
এই নীতির পেছনে কেবল প্রশাসনিক বাস্তবতা নয়, ইসলামী আইনচিন্তারও একটি সুস্পষ্ট নৈতিক ভিত্তি ছিল। কুরআন ন্যায়, ভারসাম্য এবং মানুষের সামর্থ্যের প্রতি সংবেদনশীলতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। “আল্লাহ কোনো ব্যক্তির ওপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করেন না” (২:২৮৬)—এই আয়াতটি মূলত ব্যক্তিগত ধর্মীয় দায়িত্বের প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হলেও পরবর্তী মুসলিম আইনজ্ঞরা জননীতি ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব বণ্টনের আলোচনায় এর নীতিগত তাৎপর্য বিবেচনা করেছেন। একইভাবে নবী ﷺ-এর সুপরিচিত নীতি—”ক্ষতি করা যাবে না, আর ক্ষতির প্রতিদানে ক্ষতিও করা যাবে না”—পরবর্তী ইসলামী রাজনৈতিক ও আইনচিন্তায় একটি মৌলিক নীতিতে পরিণত হয়। ফলে রাজস্ব আদায়ের উদ্দেশ্য শুধু রাজকোষ পূরণ ছিল না; উৎপাদনক্ষম সমাজকে টিকিয়ে রাখাও ছিল রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ।
দ্বিতীয় স্তম্ভ ছিল বাংলার দ্বৈত মুদ্রাব্যবস্থা। সুলতানি বাংলায় রুপার টাকার পাশাপাশি কড়ির ব্যাপক ব্যবহারকে অনেক সময় কেবল দৈনন্দিন লেনদেনের সুবিধা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু এর অর্থনৈতিক তাৎপর্য ছিল আরও গভীর। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মূল্যবান ধাতব মুদ্রা ব্যবহৃত হলেও গ্রামীণ বাজার, কৃষিপণ্য এবং ক্ষুদ্র লেনদেনের বড় অংশই কড়িভিত্তিক ছিল। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে রুপার সংকট কিংবা ধাতব মুদ্রার মূল্য ওঠানামার অভিঘাত সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করতে পারত না। এক অর্থে এই দ্বৈত মুদ্রাব্যবস্থা বৈশ্বিক বাজার ও স্থানীয় অর্থনীতির মধ্যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক বাফার হিসেবে কাজ করত।
তৃতীয় স্তম্ভ ছিল ওয়াকফ ও হিসবার মতো প্রতিষ্ঠান। আধুনিক আলোচনায় এগুলোকে প্রায়ই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সংকীর্ণ পরিসরে সীমাবদ্ধ করা হয়। অথচ মধ্যযুগীয় বাংলায় এগুলো ছিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ওয়াকফের ভিত্তি ছিল এমন একটি নৈতিক-আইনি ধারণা, যেখানে ব্যক্তিগত মালিকানাকে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও সম্পদের সামাজিক দায়িত্বকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কুরআন সম্পদকে কেবল ধনীদের মধ্যে আবর্তিত হওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে (৫৯:৭) এবং আল্লাহর পথে স্থায়ীভাবে সম্পদ ব্যয়ের প্রতি উৎসাহ দিয়েছে (২:২৬১; ৩:৯২)। এই নীতিগুলোর আলোকে মুসলিম সমাজে ওয়াকফ এমন এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যার মাধ্যমে সম্পদের একটি অংশ স্থায়ীভাবে জনকল্যাণের জন্য নিবেদিত থাকত। নবী ﷺ-এর সাদাকাহ জারিয়াহর ধারণা এবং পরবর্তী ফকীহদের আইনি ব্যাখ্যা ওয়াকফকে একটি দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেয়।
ফলে মসজিদ, মাদ্রাসা, সরাইখানা, পানীয় জলের ব্যবস্থা, সেতু, হাসপাতাল এবং দরিদ্র ও এতিমদের সহায়তার মতো বহু প্রতিষ্ঠান কেবল শাসকের অনুদানের ওপর নির্ভরশীল ছিল না; তাদের জন্য তৈরি হয়েছিল দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভিত্তি। আধুনিক পরিভাষায় বলতে গেলে, ওয়াকফ ছিল রাষ্ট্রের বাইরে গড়ে ওঠা একটি institutional social safety net, যা সংকটের সময় সমাজের অভিঘাত শোষণ করতে পারত।
একইভাবে হিসবা ছিল বাজারে ন্যায্যতা ও জনস্বার্থ রক্ষার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। এর কাজ শুধু ওজনে কম দেওয়া বা ভেজাল রোধ করা ছিল না; কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, মজুতদারি, একচেটিয়া বাজারচর্চা এবং জনস্বার্থবিরোধী বাণিজ্যিক আচরণ প্রতিরোধও এর দায়িত্বের মধ্যে পড়ত। কুরআনের “মাপে ও ওজনে পূর্ণতা দাও” (১১:৮৫; ২৬:১৮১–১৮৩) এবং “ধ্বংস তাদের জন্য, যারা ওজনে কম দেয়” (৮৩:১–৩)—এই নির্দেশনাগুলো পরবর্তী ইসলামী প্রশাসনিক চিন্তায় হিসবার নৈতিক ভিত্তি গড়ে দেয়। আল-মাওয়ারদিসহ বহু ধ্রুপদি মুসলিম চিন্তাবিদ হিসবাকে কেবল ধর্মীয় অনুশাসনের প্রয়োগ হিসেবে নয়, বরং ন্যায়ভিত্তিক বাজার-শাসনের অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
এই তিনটি স্তম্ভ—ফসল-সংবেদনশীল রাজস্বনীতি, স্থানীয় অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেওয়া মুদ্রা কাঠামো এবং ওয়াকফ-হিসবার মতো সামাজিক ও বাজার প্রতিষ্ঠান—মিলে এমন একটি অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলেছিল, যেখানে ঝুঁকি কোনো একক গোষ্ঠীর ওপর বর্তাত না। কৃষক, ব্যবসায়ী, স্থানীয় সমাজ এবং রাষ্ট্র—প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে সেই ঝুঁকির অংশীদার ছিল। ইবনে বতুতা এই ব্যবস্থার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেননি; তিনি দেখেছিলেন তার ফলাফল। ইতিহাসবিদের কাজ হলো সেই দৃশ্যমান সমৃদ্ধির অন্তর্নিহিত প্রাতিষ্ঠানিক যুক্তিকে পুনর্গঠন করা। কারণ কোনো সভ্যতার শক্তি কেবল তার সম্পদে নয়, বরং সেইসব প্রতিষ্ঠানে নিহিত থাকে, যেগুলো নীরবে উৎপাদন, বণ্টন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি নির্মাণ করে। বাংলার ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায়গুলোকে বোঝার জন্য তাই প্রথমে এই প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিটিই বোঝা জরুরি।
বাংলার ইতিহাসে ১৫৭৬ সাল নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ। দাউদ খান কররানির পরাজয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীন সুলতানি বাংলার অবসান ঘটে এবং বাংলা মুঘল সাম্রাজ্যের একটি সুবায় পরিণত হয়। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতার এই পরিবর্তনকে যদি আমরা সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছেদ হিসেবে পড়ি, তাহলে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা আমাদের চোখ এড়িয়ে যাবে। কারণ মুঘল বিজয়ের পর বাংলার অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই বহাল ছিল। রাজস্ব প্রশাসন চলছিল, কাজি আদালত কার্যকর ছিল, ওয়াকফ ব্যবস্থা টিকে ছিল, বাজার সচল ছিল, এমনকি বাংলার রপ্তানিমুখী বস্ত্রশিল্পও আন্তর্জাতিক বাজারে তার প্রতিযোগিতা ধরে রেখেছিল। ষোড়শ শতকের শেষভাগে ইংরেজ পর্যটক রালফ ফিচ সোনারগাঁওয়ের সূক্ষ্ম বস্ত্রশিল্পের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা স্পষ্ট করে যে মুঘল বিজয়ের পর বাংলার উৎপাদনব্যবস্থা কোনো আকস্মিক ভাঙনের মুখে পড়েনি।
কিন্তু ইতিহাসে বড় পরিবর্তন সব সময় প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বে ধরা পড়ে না; অনেক সময় তা ধরা পড়ে প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতায়। বাংলায় মুঘল যুগের রূপান্তরও ছিল মূলত সেই ধরনের। সুলতানি আমলে যে প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলার নিজস্ব কৃষি, বাজার ও সমাজকে সংগঠিত রাখার জন্য কাজ করত, মুঘল শাসনের অধীনে সেই একই প্রতিষ্ঠান ক্রমশ একটি বৃহত্তর সাম্রাজ্যিক রাজনৈতিক অর্থনীতির অংশে পরিণত হয়। বাংলা তখন আর একটি স্বাধীন রাজনৈতিক কেন্দ্র নয়; বরং আগ্রা এবং পরে দিল্লিকেন্দ্রিক সাম্রাজ্যের অন্যতম সমৃদ্ধ রাজস্বপ্রদানকারী প্রদেশ। ফলে প্রতিষ্ঠানের রূপ অপরিবর্তিত থাকলেও তাদের জবাবদিহি, অগ্রাধিকার এবং সম্পদপ্রবাহ ধীরে ধীরে স্থানীয় সমাজ থেকে সাম্রাজ্যিক কেন্দ্রের দিকে পুনর্নির্দেশিত হতে থাকে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় রাজস্বব্যবস্থায়। মুঘল প্রশাসন সুলতানি আমলের উৎপাদনভিত্তিক রাজস্ব-যুক্তিকে পুরোপুরি বাতিল করেনি; বরং তাকে আরও মানিকৃত ও সাম্রাজ্যব্যাপী প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে। ভূমি জরিপ, উৎপাদনক্ষমতার হিসাব এবং রাজস্ব নির্ধারণে অধিকতর একরূপতা আনার চেষ্টা প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়িয়েছিল, কিন্তু একই সঙ্গে স্থানীয় কৃষি বাস্তবতার তুলনায় সাম্রাজ্যিক রাজস্ব-চাহিদাকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেছিল। ফলে কৃষি উৎপাদনের ঝুঁকি ভাগাভাগির যে নমনীয়তা সুলতানি আমলে তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল, তা ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে আসে।
তবে এই পরিবর্তনকে বাংলার তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক অবক্ষয় হিসেবে ব্যাখ্যা করা হবে ইতিহাসের অতিসরলীকরণ। সপ্তদশ শতকেও বাংলা এশিয়ার অন্যতম উৎপাদনশীল অঞ্চল ছিল। মসলিন, রেশম, চিনি, লবণ, নীলসহ নানা পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা ধরে রেখেছিল। অর্থাৎ উৎপাদনের ভিত্তি তখনও শক্তিশালী ছিল। পরিবর্তনটি শুরু হয়েছিল উৎপাদনে নয়, বরং উদ্বৃত্তের প্রবাহ, প্রশাসনিক প্রণোদনা এবং সম্পদ বণ্টনের যুক্তিতে। এই কারণেই মুঘল যুগকে বাংলার অর্থনৈতিক পতনের যুগের পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্নির্দেশের যুগ বলা অধিকতর যথার্থ।
ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। মুঘল শাসকেরা ওয়াকফ বিলুপ্ত করেননি; ইসলামী আইনের অধীনে এর বৈধতা অক্ষুণ্ণ ছিল এবং কাজি আদালতও সেই বৈধতা স্বীকার করত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওয়াকফ সম্পত্তির পুনর্মূল্যায়ন, সনদ যাচাই এবং কিছু ক্ষেত্রে সেগুলোকে খালিসা জমির অন্তর্ভুক্ত করার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে প্রতিষ্ঠানের আইনি অস্তিত্ব টিকে থাকলেও তার আর্থিক সক্ষমতা ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে। শিক্ষা, ধর্মীয় কার্যক্রম এবং স্থানীয় জনকল্যাণে ওয়াকফের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ থাকলেও তার স্বাধীন সামাজিক পরিসর আগের তুলনায় সীমিত হয়ে যায়। তাই মুঘল যুগকে ওয়াকফের বিলুপ্তি নয়, বরং তার ধীর প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্নির্দেশ হিসেবে দেখাই অধিকতর যথাযথ।
হিসবার ক্ষেত্রেও অনুরূপ প্রবণতা দেখা যায়। বাজারে ন্যায্যতা নিশ্চিত করা, প্রতারণা ও মজুতদারি প্রতিরোধ করা এবং জনস্বার্থ রক্ষা করাই ছিল এই প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য। মুঘল প্রশাসন এই নৈতিক কাঠামো পুরোপুরি পরিত্যাগ করেনি। কিন্তু ক্রমবর্ধমান সাম্রাজ্যিক রাজস্বস্বার্থ এবং কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ফলে হিসবার স্বাধীন সামাজিক ভূমিকা সংকুচিত হতে থাকে। বাজারের নৈতিক তত্ত্বাবধান ক্রমশ সাম্রাজ্যিক প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের অধীন হয়ে পড়ে।
ফলে মুঘল বাংলাকে বোঝার জন্য “ধারাবাহিকতা” কিংবা “বিচ্ছেদ”—এই দুই বিপরীত ধারণার কোনোটিই একা যথেষ্ট নয়। সুলতানি আমলের প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়নি, আবার আগের অর্থেও অপরিবর্তিত থাকেনি। একই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নতুন এক রাজনৈতিক অর্থনীতির অধীনে নতুন উদ্দেশ্য পূরণ করতে শুরু করেছিল। এই কারণেই মুঘল যুগ ছিল মূলত institutional reorientation-এর যুগ—প্রতিষ্ঠানের রূপের নয়, তাদের অভিমুখের পরিবর্তনের যুগ।
প্রাতিষ্ঠানিক এই পুনর্নির্দেশ (re-orientation) তাৎক্ষণিক কোনো সমস্যা সৃষ্টি করেনি বটে, কিন্তু এর মধ্য দিয়েই বাংলার রাজনৈতিক অর্থনীতির কেন্দ্র ধীরে ধীরে বাংলার বাইরে সরে যায়। পরবর্তী ঔপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশ শাসন নতুন প্রতিষ্ঠান নির্মাণের চেয়ে এই পুনর্নির্দেশিত কাঠামোকেই আরও কঠোর নিষ্কাশনমূলক যুক্তির অধীনে নিয়ে আসে। ফলে যে প্রতিষ্ঠানগুলো একসময় স্থানীয় সমাজের স্থিতিশীলতা রক্ষা করত, সেগুলোই ক্রমে সেই সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বাংলার প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর পরিবর্তনের সূত্রপাত তাই ১৭৫৭ সালে নয়; তার বহু আগেই, মুঘল যুগের এই নীরব পুনর্নির্দেশের মধ্য দিয়ে।
মুঘল আমলে বাংলার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে পরিবর্তনের সূচনা হলেও তার মৌলিক ভিত্তি তখনও অটুট ছিল। প্রকৃত বিচ্ছেদ শুরু হয় ১৭৫৭ সালের পর এবং তা নতুন মাত্রা পায় ১৭৬৫ সালে, যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি লাভ করে। এই পরিবর্তন কেবল শাসক বদলের ঘটনা ছিল না; এটি রাষ্ট্র, বাজার এবং সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার সূচনা। যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে কৃষি, বাণিজ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রেখেছিল, ঔপনিবেশিক শাসনে সেই ভারসাম্য ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। বাংলার ইতিহাসে এটিই ছিল প্রকৃত institutional rupture।
সবচেয়ে মৌলিক পরিবর্তন ঘটে রাষ্ট্রের চরিত্রে। সুলতানি ও মুঘল আমলে রাজস্ব আদায়কারী রাষ্ট্র এবং বাজারে অংশগ্রহণকারী বণিক ছিল পৃথক সত্তা। কোম্পানি শাসনে এই বিভাজন বিলুপ্ত হয়। একই প্রতিষ্ঠান কৃষকের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করছে, আবার সেই রাজস্বের অর্থ দিয়েই বাংলার পণ্য কিনে ইউরোপে রপ্তানি করছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক ক্ষমতা ও বাণিজ্যিক স্বার্থ প্রথমবারের মতো একই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একীভূত হয়। সমসাময়িক ব্রিটিশ রাষ্ট্রনায়ক এডমন্ড বার্ক এই ব্যবস্থাকে এমন এক রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, যার হাতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা আছে, কিন্তু রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব নেই।
এই পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে রাজস্বনীতিতে। পূর্ববর্তী যুগে বিভিন্ন মাত্রায় কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে রাজস্বের একটি সম্পর্ক বজায় ছিল। কোম্পানি শাসনে রাজস্ব ক্রমশ একটি স্থির আর্থিক দাবিতে পরিণত হয়। উৎপাদন কমুক বা বাড়ুক, কৃষকের ওপর আরোপিত দাবির মৌলিক কাঠামো অপরিবর্তিত থাকে। ফলে কৃষি-ঝুঁকি আর রাষ্ট্র ও কৃষকের মধ্যে ভাগাভাগি হয় না; তা একমুখীভাবে কৃষকের ওপর স্থানান্তরিত হয়। যে ব্যবস্থায় রাষ্ট্র একসময় উৎপাদনের অনিশ্চয়তার অংশীদার ছিল, সেখানে এখন রাষ্ট্র কেবল নির্দিষ্ট রাজস্বের দাবিদার।
একই সময়ে বাজারও তার চরিত্র বদলাতে শুরু করে। গোমস্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে তাঁতিরা ধীরে ধীরে স্বাধীন উৎপাদক থেকে কোম্পানিনির্ভর উৎপাদকে পরিণত হন। উৎপাদনের ধরন, মূল্য এবং সরবরাহ ক্রমে বাজারের প্রতিযোগিতা নয়, কোম্পানির নির্দেশেই নির্ধারিত হতে থাকে। ফলে বাজার আর উৎপাদক ও ক্রেতার মধ্যে স্বাভাবিক বিনিময়ের ক্ষেত্র রইল না; তা ঔপনিবেশিক বাণিজ্যিক ক্ষমতার সম্প্রসারণের যন্ত্রে পরিণত হয়। একই সঙ্গে বাংলা থেকে উদ্বৃত্ত সম্পদের ধারাবাহিক বহিঃপ্রবাহ শুরু হয়। সুলতানি আমলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের একটি বড় অংশ বাংলার উৎপাদন ও সমাজে পুনর্বিনিয়োগ হতো। মুঘল আমলে সেই প্রবাহের একটি অংশ সাম্রাজ্যের অন্য অঞ্চলে সরে গেলেও তার কেন্দ্র ছিল ভারতীয় উপমহাদেশ। কোম্পানি শাসনে উদ্বৃত্ত নিয়মিতভাবে ব্রিটেনে স্থানান্তরিত হতে থাকে। অর্থাৎ বাংলা থেকে সম্পদ বেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেই সম্পদ আর বাংলার উৎপাদনক্ষমতা পুনর্গঠনে ফিরে আসছে না।
সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন ছিল সমান গভীর। ওয়াকফ একদিনে বিলুপ্ত হয়নি, কিন্তু ঔপনিবেশিক বিচারব্যবস্থা ধীরে ধীরে তাকে জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, সাধারণ সম্পত্তি আইনের আলোকে মূল্যায়ন করতে শুরু করে। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা, পানীয় জল, মুসাফিরখানা কিংবা দরিদ্র সহায়তার জন্য নিবেদিত বহু সম্পদের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে। ইসলামী আইনে ওয়াকফের উদ্দেশ্য ছিল সম্পদের একটি অংশকে স্থায়ীভাবে সমাজের জন্য সংরক্ষণ করা; ঔপনিবেশিক আইনি কাঠামো সেই সামাজিক যুক্তির পরিবর্তে সম্পত্তিগত অধিকারের প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দেয়। এর ফলে সমাজের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ institutional shock absorber ধীরে ধীরে তার কার্যকারিতা হারাতে থাকে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের প্রথম বড় পরীক্ষা আসে ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষে। দীর্ঘদিন ধরে এই দুর্ভিক্ষকে কেবল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও পরবর্তী গবেষণা দেখিয়েছে, ফসলহানি ছিল সংকটের সূচনা; বিপর্যয়ের কারণ ছিল প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা। রাজস্ব আদায় অব্যাহত ছিল, খাদ্যবাজারে মজুতদারি ও জল্পনা-কল্পনা বেড়েছিল, স্থানীয় ঋণব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং সামাজিক সহায়তার কাঠামো কার্যত ভেঙে গিয়েছিল। ফলে কৃষি, বাজার এবং সামাজিক নিরাপত্তা—এই তিনটি স্তম্ভ একই সঙ্গে ব্যর্থ হয়। অমর্ত্য সেনের ভাষায়, দুর্ভিক্ষের কারণ শুধু খাদ্যের ঘাটতি নয়; মানুষের খাদ্যে প্রবেশাধিকারের ভেঙে পড়া। ১৭৭০ সালের বাংলা সেই সত্যেরই একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ।
প্রায় একশ সত্তর বছর পরে ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে একই প্রাতিষ্ঠানিক যুক্তি ভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পুনরাবৃত্ত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, Denial Policy, নৌপরিবহন বিপর্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা মিলিয়ে খাদ্যে মানুষের প্রবেশাধিকার আবারও ভেঙে পড়ে। খাদ্য ছিল, বাজারও ছিল; কিন্তু তা মানুষের নাগালের মধ্যে ছিল না। ফলে দুর্ভিক্ষ আবারও খাদ্যের স্বল্পতার নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের ভঙ্গুরতার নির্মম প্রকাশে পরিণত হয়।
১৭৭০ এবং ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের মধ্যে প্রায় একশ সত্তর বছরের ব্যবধান। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন, শাসক ভিন্ন, বৈশ্বিক পরিস্থিতিও ভিন্ন। তবু উভয় বিপর্যয়ের অন্তর্নিহিত যুক্তি বিস্ময়করভাবে এক। দুটি ক্ষেত্রেই ঝুঁকি ভাগাভাগির প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছিল, বাজার তার সামাজিক চরিত্র হারিয়েছিল এবং রাষ্ট্র জনকল্যাণের পরিবর্তে রাজস্ব আহরণ ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল। এই কারণে দুর্ভিক্ষগুলোকে বিচ্ছিন্ন মানবিক বিপর্যয় হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের ঐতিহাসিক পরিণতি হিসেবে দেখা অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।
সুলতানি, মুঘল এবং ঔপনিবেশিক বাংলা—এই তিনটি পর্বকে তাই কেবল তিনটি রাজনৈতিক যুগ হিসেবে পড়লে বাংলার দীর্ঘ ইতিহাসের মূল স্রোতটি অধরা থেকে যায়। প্রথম পর্বে কৃষি, বাজার এবং সামাজিক নিরাপত্তার মধ্যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য গড়ে ওঠে; দ্বিতীয় পর্বে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিমুখ ধীরে ধীরে সাম্রাজ্যিক প্রয়োজনের দিকে পুনর্নির্দেশিত হয়; আর তৃতীয় পর্বে ঔপনিবেশিক শাসন সেই কাঠামোকেই এমনভাবে পুনর্গঠন করে, যেখানে উদ্বৃত্ত আহরণ সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রাধান্য পায়। ইবনে বতুতার দেখা সমৃদ্ধ বাংলা এবং ১৭৭০ ও ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলা—এই দুই বাস্তবতার মধ্যবর্তী ইতিহাস মূলত সেই নীরব প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের ইতিহাস। সভ্যতার উত্থান বা পতন অনেক সময় দৃশ্যমান রাজনৈতিক ঘটনায় নয়; শুরু হয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে, তাদের প্রণোদনা, কার্যকারিতা এবং সামাজিক উদ্দেশ্যের ধীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।

References

  1. Battuta, I. (1994). The Travels of Ibn Battuta, A.D. 1325–1354: Volume IV (H. A. R. Gibb, Trans.; C. F. Beckingham, Ed.). Hakluyt Society; Cambridge University Press.
  2. Fitch, R. (1921). The voyage of Ralph Fitch. In W. Foster (Ed.), Early Travels in India, 1583–1619 (pp. 1–47). Oxford University Press.
  3. North, D. C. (1990). Institutions, Institutional Change and Economic Performance. Cambridge University Press.
  4. Eaton, R. M. (1993). The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204–1760. University of California Press.
  5. Habib, I. (2013). The Agrarian System of Mughal India, 1556–1707 (3rd ed.). Oxford University Press.
  6. Moosvi, S. (2016). The Economy of the Mughal Empire c. 1595: A Statistical Study (2nd ed.). Oxford University Press.
  7. Deyell, J. S. (1990). Living Without Silver: The Monetary History of Early Medieval North India. Oxford University Press.
  8. Kahf, M. (1999). Financing the development of Awqaf property. American Journal of Islamic Social Sciences, 16(4), 39–68. https://doi.org/10.35632/ajiss.v16i4.2099
  9. Kuran, T. (2010). The Long Divergence: How Islamic Law Held Back the Middle East. Princeton University Press.
  10. Al-Mawardi, A. (1996). The Ordinances of Government: Al-Ahkam as-Sultaniyyah w’al-Wilayat al-Diniyya (W. H. Wahba, Trans.). Garnet Publishing. (Original work written approximately in the 11th century).
  11. Robins, N. (2012). The Corporation That Changed the World: How the East India Company Shaped the Modern Multinational (2nd ed.). Pluto Press.
  12. Burke, E. (2000). The Writings and Speeches of Edmund Burke, Volume VII: India, The Hastings Trial, 1789–1794 (P. J. Marshall, Ed.). Clarendon Press.
  13. Sen, A. (1981). Poverty and Famines: An Essay on Entitlement and Deprivation. Clarendon Press.

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *